আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ১১ জন

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল প্রকাশ, হামলা হলে পাশে দাঁড়াবে তিন দেশ

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ্যে এসেছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ পরিস্থিতিতে আক্রান্ত দেশকে সামরিক সক্ষমতাসহ পারস্পরিক সহায়তার বিভিন্ন উপায়ে সহযোগিতা করবে অন্য দুই দেশ।

গত আগস্টে স্বাক্ষরিত এ চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশের মধ্যে একটি নতুন প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ন্যাটো জোটের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতোই এতে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ সংগ্রহ করেছে। মঙ্গলবার তুরস্ক সরকারও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল দেশটির সংসদে জমা দিয়েছে। এতে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে সরাসরি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে সদস্য কোনো দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বা ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর সশস্ত্র হামলা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

চুক্তিতে পারস্পরিক সামরিক সহায়তার অঙ্গীকার

চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত হুমকির মুখে পড়লে সেই হুমকি মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলো প্রয়োজনীয় সব উপায় ব্যবহার করবে।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশের ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অন্য কোনো দেশ বা একাধিক দেশের সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে আক্রান্ত দেশকে অবিলম্বে সহায়তা দেবে অন্য সদস্যরা।

কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। সদস্য দেশগুলো নিজেদের বিদ্যমান সম্পদ ও সক্ষমতার সীমার মধ্যে থেকে সহযোগিতা করবে। এ সহায়তার মধ্যে সামরিক উপায় ও সক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এ ছাড়া জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করাও চুক্তিটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহযোগিতা

১৬টি অনুচ্ছেদে গঠিত এ চুক্তিতে শুধু পারস্পরিক সামরিক সহায়তার অঙ্গীকারই নয়, প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাড়াবে। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সামরিক সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পের কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থাও থাকবে।

শান্তিকাল ও যুদ্ধকাল—উভয় সময়েই দেশগুলো সামরিক কর্মকর্তাদের পারস্পরিক বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং সামরিক মহড়ার আয়োজন করতে পারবে। এর লক্ষ্য তিন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও কার্যকর সহযোগিতা বাড়ানো।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায়ও যৌথ উদ্যোগ জোরদারের কথা বলা হয়েছে চুক্তিতে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, এমন সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় তিন দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।

পাশাপাশি পারস্পরিক সম্মত নিরাপদ মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করা হবে। এ ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত উপাত্তের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সদস্য দেশগুলো শান্তিকাল, যুদ্ধকাল কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে পরস্পরকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে। তবে এ সহযোগিতা নির্ভর করবে সরবরাহব্যবস্থার প্রাপ্যতা ও সামঞ্জস্যের ওপর।

গঠন করা হবে কৌশলগত প্রতিরক্ষা কমিটি

চুক্তির অষ্টম অনুচ্ছেদে ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এ কমিটিতে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানেরা থাকবেন।

কমিটির দায়িত্ব হবে যৌথ প্রতিরক্ষার কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো এবং চুক্তি বাস্তবায়নের পথে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা দূর করা।

কমিটি বছরে দুবার বৈঠক করবে। পালাক্রমে তিন দেশের একেকটি দেশ বৈঠকের আয়োজন করবে। প্রয়োজনে দেশগুলোর নেতারা বছরে একবার বৈঠকে বসতে পারবেন।

মূল তিন দেশের সর্বসম্মতিতে এ চুক্তিতে অন্য দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম ও নীতিও নির্ধারণ করতে পারবে কমিটি।

চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর মহাসচিব তিন দেশের মধ্য থেকে পালাক্রমে তিন বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন। প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তানের নাগরিক।

প্রথম ১০ বছর চুক্তি থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই

চুক্তিতে মেয়াদ শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ, এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ১০ বছর কোনো সদস্য দেশ এটি থেকে সরে যেতে পারবে না। ১০ বছর পার হলে কোনো দেশ চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক মাধ্যমে অন্য সদস্য দেশগুলোকে অন্তত তিন মাস আগে লিখিতভাবে জানাতে হবে।

চুক্তির আওতায় পাওয়া গোপনীয় তথ্য ও নথির সুরক্ষা প্রত্যাহার বা চুক্তির অবসানের পরও বজায় রাখতে হবে। একইভাবে, চুক্তি শেষ হওয়ার আগে সম্মত হওয়া চলমান কার্যক্রম ও প্রকল্পের ওপর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে না।

চুক্তির ব্যাখ্যা বা বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে সদস্য দেশগুলো আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে তা বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সমাধান করবে। এতে সংশোধনী আনতে হলে তিন দেশের মধ্যে আলোচনা ও সর্বসম্মতি প্রয়োজন হবে।

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের নিজ নিজ অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর চুক্তিটি কার্যকর হবে। কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির সচিবালয়ে অনুমোদনের সর্বশেষ দলিল জমা দেওয়ার দিন থেকে এটি কার্যকর বলে গণ্য হবে।

তুর্কি, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় চুক্তিটির তিনটি মূল কপি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিনটি ভাষার পাঠ সমানভাবে প্রামাণ্য বলে বিবেচিত হলেও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য দেখা দিলে ইংরেজি পাঠকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বন্দরে জেটি নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন

১

ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বিশ্বাসের অধিকার রক্ষায় FoRB Forum-এর নতুন কমিটি

২

৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস: সাধারণ ছুটিসহ সরকারের নানা কর্মসূচি ঘোষণা

৩

‘আপা আসবে তাই চলে যাচ্ছি, বিদায় বাংলাদেশ’—ফেসবুকে আসিফ মাহমুদের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট

৪

পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে বোর্ডের প্রথম সভা শুরু

৫

নতুন সিনেমা ‘আবার দেখা হলো’, ফের জুটি চঞ্চল চৌধুরী ও নাজিফা তুষি

৬

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার করলেন ট্রাম্প

৭

গাজীপুরে ফের শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ

৮

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের নিয়ন্ত্রণও পেল ডেমোক্র্যাটরা, চাপে ট্রাম্প

৯

আফগানিস্তান প্রিমিয়ার লিগে দল পেলেন সাকিব, নাহিদ ও শামীম

১০

৭ নভেম্বর উপলক্ষে ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করলেন প্রধানমন্ত্রী

১১

সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিশেষ কমিটির বৈঠকে ইব্রাহীম নিরব, তুলে ধরলেন জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষাসহ একাধিক প্রস্তাব

১২

পশুখাদ্য সরবরাহে সিন্ডিকেট! আসল ঘটনা উদঘাটন

১৩

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ডেমোক্র্যাটদের সব বিলে ভেটো দেবেন ট্রাম্প

১৪

এক মাস দুই দিন পর কারামুক্ত মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান

১৫

মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনায় বিপাশা হায়াত

১৬

পর্দায় আসছে জসীমউদ্দীনের কালজয়ী সৃষ্টি ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, শেষ ৭০ শতাংশ শুটিং

১৭

আজ জেলহত্যা দিবস: কারাগারে নির্মম হত্যার শিকার জাতীয় চার নেতা

১৮

আফগানিস্তান প্রিমিয়ার লিগে ডায়মন্ড ক্যাটাগরিতে সাকিব-লিটন, তালিকায় ১৯ বাংলাদেশি

১৯

মিরপুরে পোশাকশ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ

২০