মঙ্গলবার ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলন চলাকালে প্রকাশিত আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক প্রক্ষেপণের চেয়েও কম।
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ করেছে। অন্যদিকে, গত জুলাইয়ে এডিবি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। সেপ্টেম্বরে তা কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে সংস্থাটি।
আইএমএফের সর্বশেষ প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছিল। এর আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ১০ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি।
আইএমএফের পূর্বাভাসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরে ভারতে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে।
ভুটানের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। মালদ্বীপের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
এ ছাড়া নেপাল ও শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ করে হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। দেশ দুটিতে মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮ ও ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।
চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছিল, বাংলাদেশ টানা চতুর্থ বছরের মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পথে রয়েছে। জ্বালানির ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণ প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা এবং সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক অধিকাংশ দেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেছে। প্রতিবেদনে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে—এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছিল। এরপর থেকে প্রবৃদ্ধির গতি কমতে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৪ শতাংশের নিচে নেমে আসে। ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত এ দুর্বলতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরার আশা করা হলেও সেই পুনরুদ্ধার এখনো দৃশ্যমান হয়নি। জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি ও সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার প্রভাব আগের ধারণার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। পাশাপাশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও দুর্বল থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শ্লথগতির প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট শিল্প খাতে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাত সংকুচিত হয়েছে, যা করোনাভাইরাস মহামারির পর প্রথম ঘটনা।
জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যবসায়ীদের আস্থার ঘাটতি, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নকে এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।
মন্তব্য করুন