কয়েকজন সংসদ-সদস্যসহ জামায়াতে ইসলামীর কিছু নেতাকর্মীর বিতর্কিত মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কঠোর সাংগঠনিক কাঠামো ও শক্ত চেইন অব কমান্ডের কারণে অভ্যন্তরীণ অস্বস্তি প্রকাশ্যে খুব বেশি না এলেও একের পর এক ঘটনায় চাপের মুখে পড়ছে দলটি।
বিশেষ করে নৈতিকতা, স্বজনপ্রীতি, সরকারি অনুদান-ত্রাণ বিতরণ এবং জনপ্রতিনিধিদের আচরণ নিয়ে ওঠা অভিযোগ জামায়াতের ঘোষিত আদর্শ ও নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ভোটার বা সমর্থক না হলেও আদর্শিক কারণে দলটিকে ইতিবাচকভাবে দেখতেন, এমন মানুষের একটি অংশের মধ্যেও এসব ঘটনায় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন।
তবে জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের দাবি, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে পুরো দলের অবস্থান মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। তাদের ভাষ্য, কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার ও সদস্যপদ বাতিলের সিদ্ধান্তকে তারা এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
জামায়াতের সংসদ-সদস্য ও ইসলামি বক্তা মুফতি আমির হামজার কয়েকটি বক্তব্যও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চের শেষদিকে কুষ্টিয়া সদরের একটি মসজিদে দেওয়া বক্তব্যে নারী সংসদ-সদস্যদের নিয়ে তার মন্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা হয়। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলাও করা হয়।
এর আগে কুষ্টিয়ায় দেওয়া আরেক বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে নিয়ে মন্তব্য করেও সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একটি ওয়াজে দেওয়া বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বড় অস্বস্তির ঘটনাগুলোর একটি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ-সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে। এক নারীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। দলীয় তদন্তের পর জামায়াত জানায়, তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের পাশাপাশি বিষয়টি নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় সংসদকে অবহিত করার সিদ্ধান্তও জানায় জামায়াত। তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে পরবর্তী সময়ে আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্নও সামনে আসে।
নড়াইল-২ আসনের সংসদ-সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর বিরুদ্ধে ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদানের তালিকায় নিজের মেয়ের নামে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি নিজ ইউনিয়ন ও শ্বশুরবাড়ি এলাকার মানুষের আধিক্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। এমপি অবশ্য দাবি করেন, তার অগ্রিম স্বাক্ষর করা প্যাড ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সহকারী তালিকাটি তৈরি করেছিলেন।
রংপুরের পীরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ-সদস্য মো. নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে আত্মীয়স্বজনকে সভাপতি করার অভিযোগ ওঠে। খুলনা-৬ আসনের সংসদ-সদস্য আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধেও ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিতরণে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।
এসব অভিযোগের পর জামায়াতের কেন্দ্র থেকে সংসদ-সদস্যদের জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়। সরকারি অনুদান, ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ব্যক্তিগত সহকারী বা তাদের স্বজনদের জন্য কোনো ধরনের সুপারিশ বা বরাদ্দ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ-সদস্য আব্দুল মুনতাকিম সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তৃতায় তার বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ উল্লেখ করায় সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে নির্বাচনি হলফনামায় বাবা-মা দুজনই জীবিত থাকার তথ্য সামনে এলে তিনি বক্তব্যটিকে ভুল বা অসাবধানতাবশত হয়েছে বলে দুঃখপ্রকাশ করেন।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ-সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী মো. আরমান উদ্দিনকে ঘিরেও এলাকায় ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আলোচনায় আসে। স্থানীয়ভাবে তাকে ‘আরমান এমপি’ নামে ডাকার বিষয়টিও বিতর্ক তৈরি করে।
এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ-সদস্য মিজানুর রহমান সংসদ-সদস্যদের সরকারি বাসভবনের জন্য ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও পর্দার দাবি তুলে সমালোচনার মুখে পড়েন।
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধেও সরকারি বরাদ্দের একটি বাইসাইকেল প্রকৃত উপকারভোগীর পরিবর্তে নিজের নাতনিকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে বাইসাইকেলটি ফেরত দিয়ে প্রকৃত উপকারভোগীকে দেওয়া হয় এবং তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে সার মজুতের অভিযোগে জরিমানা হওয়ার পর জামায়াতের স্থানীয় নেতা মো. মনিরুল ইসলামের সদস্যপদও বাতিল করা হয়। এছাড়া নৈতিকস্খলন, দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নিয়েছে দলটি।
সর্বশেষ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি ও অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার, রিমান্ড ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা চলছে।
যাত্রী হয়রানি ও বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদকে কেউ কেউ সমর্থন করলেও তার প্রতিবাদের ভাষা ও আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এ ঘটনায় জামায়াত তার পাশে অবস্থান নেওয়ায় দলটির ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিতর্কিত ঘটনাগুলোর পর জামায়াত বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার, বিভিন্ন নেতাকর্মীর সদস্যপদ বাতিল এবং সরকারি অনুদান ও ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা জারির বিষয়গুলো দলটির পক্ষ থেকে তুলে ধরা হচ্ছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, মানুষের সংগঠনে মানুষ হিসেবে ভুলত্রুটি ঘটতে পারে। তবে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে দল কোনো আপস করবে না। কোনো নেতাকর্মী অন্যায় বা অনৈতিক কাজে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুমও দাবি করেছেন, অভিযোগ ওঠার পর দল দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং কেন্দ্র থেকে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর মতে, দুর্নীতি ও নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে জামায়াত সম্পর্কে মানুষের একটি ইতিবাচক ধারণা রয়েছে। ফলে দলটির কোনো নেতার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ উঠলে তা স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দেয়। তবে তিনি দলটির দ্রুত সাংগঠনিক পদক্ষেপের বিষয়টিও ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, জামায়াত যে ধরনের নীতি-নৈতিকতার কথা বলে, তার সঙ্গে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে দলটির ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেছেন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আব্দুল লতিফ মাসুমের মতে, ব্যক্তির ভুল হতে পারে, কিন্তু জামায়াতের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি নৈতিক আচরণ প্রত্যাশা করে। তার মতে, আক্তারুজ্জামানের বিমানবন্দরকেন্দ্রিক প্রতিবাদের মূল বিষয়টি সমর্থনযোগ্য হলেও প্রতিবাদের ভাষা ও আচরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, একের পর এক বিতর্ক জামায়াতের সামনে দুটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে—একদিকে নেতাকর্মীদের আচরণ ও নৈতিকতার মান ধরে রাখা, অন্যদিকে অভিযোগ ওঠার পর দ্রুত ও দৃশ্যমান সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া। দলটির ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডের সামঞ্জস্য কতটা বজায় থাকে, সেটিই এখন তাদের ভাবমূর্তি নিয়ে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়।
মন্তব্য করুন