সম্প্রতি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির আয়োজনে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে ‘আমাদের চলচ্চিত্রে সংকট, করণীয় ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা ও প্রযোজক হেলাল খান। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন। আরও উপস্থিত ছিলেন সমিতির মহাসচিব শাহীন কবির টুটুল, উপমহাসচিব কবিরুল ইসলাম রানা, বরেণ্য নির্মাতা কাজী হায়াৎ, ছটকু আহমেদ, শাহ আলম কিরণ, হাবিবুল ইসলাম হাবীব, সাইমন তারিকসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা।
পরিচালক সমিতির মহাসচিব শাহীন কবির টুটুল বলেন, দেশের বেসরকারি ব্র্যান্ডগুলোকে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত করার উপায় খুঁজতে হবে। চলচ্চিত্রের উন্নয়নে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করাও জরুরি।
সভাপতির বক্তব্যে শাহীন সুমন ভারতের মালয়ালম চলচ্চিত্রশিল্পের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ভারতের আঞ্চলিক চলচ্চিত্রশিল্প সফল হলে বাংলাদেশও সফল হতে পারে। তিনি কবিরপুরে ফিল্ম সিটির জন্য বরাদ্দ বিশাল জায়গা চলচ্চিত্রের উন্নয়নে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। এ জন্য আট থেকে দশজনের একটি প্রতিনিধি দল গঠনের কথাও বলেন তিনি।
বর্ষীয়ান নির্মাতা মতিন রহমান চলচ্চিত্রে সৃজনশীল পরিচালক ও দক্ষ চিত্রনাট্যকার তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক—দুই ধারার সিনেমাই নির্মাণ করতে হবে। শুধু বড় বাজেটের ছবির দিকে মনোযোগ না দিয়ে স্বল্প ও মাঝারি বাজেটের চলচ্চিত্র নির্মাণেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্রের উন্নয়নে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, পুরো ইকোসিস্টেম নিয়ে কাজ করতে হবে।’
প্রেক্ষাগৃহের সংকট মোকাবিলায় শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন ও কমিউনিটি সেন্টারগুলোকে সিনেমা প্রদর্শনের উপযোগী করে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। এসব স্থানে স্বল্প খরচে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করা গেলে দর্শকদের কাছে চলচ্চিত্র পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করেন এই নির্মাতা।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল বলেন, ‘ভালো সিনেমা নির্মিত হলে ভালো প্রেক্ষাগৃহও গড়ে উঠবে।’
চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক পরিকল্পনার ওপর জোর দেন আলফা আইয়ের কর্ণধার শাহরিয়ার শাকিল। তাঁর মতে, একটি সিনেমার আয়ের উৎস শুধু প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কার্যকর নীতিমালা তৈরি করা গেলে সিনেমা নির্মাণ ও প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা—দুই ক্ষেত্রেই অগ্রগতি সম্ভব।
স্টার সিনেপ্লেক্সের সঙ্গে আয় ভাগাভাগির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রযোজকদের ১৭ থেকে ১৮ শতাংশের বেশি শেয়ার দিত না। পরে কয়েকজন মিলে আলোচনার মাধ্যমে প্রথম দুই সপ্তাহের জন্য সেই অংশ ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। তাঁর মতে, আলোচনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান সম্ভব।
নির্মাতা অমিতাভ রেজা চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য উন্নয়ন, নির্মাণ এবং নির্মাণ-পরবর্তী কাজের জন্য আলাদা ধাপে অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব দেন। প্রাথমিক পর্যায়ে চিত্রনাট্য উন্নয়নের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকার তহবিল রাখার পরামর্শও দেন তিনি।
অন্যদিকে, চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু বাংলাদেশের সিনেমাকে অ্যামাজন ও নেটফ্লিক্সের মতো আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রবেশাধিকার বাড়ানো শিল্পটির বিকাশে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বর্ষীয়ান নির্মাতা কাজী হায়াৎ অতীতের প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা প্রদর্শন ও আয় ভাগাভাগির অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সরকারি অনুদানে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ প্রদর্শনের স্মৃতিচারণা করে তিনি জানান, সে সময়ের আয় ভাগাভাগির নিয়মের কারণে বলাকা হলে ছবিটির প্রিন্ট আটকে পড়েছিল।
পরে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় একজন সাংবাদিকের সমালোচনা প্রকাশিত হলে সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ বাড়ে। এরপর রাজশাহীর একটি হলে এবং পরে আবার ঢাকায় ছবিটি প্রদর্শিত হয়। চলচ্চিত্রটির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ তৈরিতে সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সেমিনারে আলোচকদের বক্তব্যে উঠে আসে, দেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে শুধু বেশি সিনেমা নির্মাণই যথেষ্ট নয়। ভালো চিত্রনাট্য, দক্ষ নির্মাতা, নতুন বিনিয়োগ, কার্যকর নীতিমালা, বিকল্প প্রদর্শনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের চলচ্চিত্রশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
মন্তব্য করুন