পাঁচ দিনের সফরে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে যাওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ২৪ সেপ্টেম্বর সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে তাঁর। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর রাতেই ঢাকার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ছাড়ার কথা রয়েছে। শুরুতে ২১ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সফরসূচি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। বাতিল হয়েছে নিউইয়র্ক থেকে সানফ্রান্সিসকো যাওয়ার কর্মসূচিও। প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়োজনে নাগরিক সভাও বাতিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের কর্মসূচি রয়েছে। সরকারি সূত্রগুলো জানায়, এবারের সফরসঙ্গীদের তালিকাও তুলনামূলক ছোট রাখা হয়েছে। বড় প্রতিনিধি দলের পরিবর্তে সীমিতসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যয়সংযমের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
জাতিসংঘের সূচি অনুযায়ী, ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য— ‘আস্থা পুনর্গঠন, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’। (United Nations)
নিউইয়র্কে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন বৈঠক ও আলোচনায় অংশ নেবেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মহামারি প্রতিরোধ ও জলবায়ু বিষয়ক আলোচনাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে তাঁর অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর উন্নয়নবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও মোকাবিলা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। (United Nations)
২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকটসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসন এবং মিয়ানমারের সংকটের মূল কারণ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করাকে গুরুত্ব দেবে ঢাকা।
২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, ‘বাংলাদেশ প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, পাচার হওয়া অর্থ-সম্পদ ফেরত আনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু ন্যায়বিচার, নারী ও শিশুর সুরক্ষা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, বিশ্বশান্তি এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
অর্থনৈতিক কূটনীতিও এবারের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার উদ্যোগ তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে সম্পৃক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফেরত আনার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও অবৈধভাবে বিদেশে স্থানান্তরিত সম্পদ পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে পারে বাংলাদেশ।
জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে গুরুত্ব পেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা, অভিযোজন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার প্রস্তুতি রয়েছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি রয়েছে।
সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের তালিকায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ আল-খালিদ আল-সাবাহ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেঙ্কোভিচ এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সল বিন ফারহান আল সৌদের নাম রয়েছে। তবে এসব বৈঠক এখনো চূড়ান্ত নয়; শেষ মুহূর্তে কর্মসূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক রহমানের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়েও আলোচনা চলছে, তবে আনুষ্ঠানিক বৈঠক এখনো চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সামনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন, তখন একই অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
ড. খলিলুর রহমান ২ জুন ২০২৬ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, তিনি অধিবেশনের প্লেনারি কার্যক্রমে সভাপতিত্ব করবেন। (United Nations)
তারেক রহমানের সফরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যেও প্রস্তুতি চলছে। ২১ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দরে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী উপস্থিত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বড় সমাবেশেরও পরিকল্পনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে স্বাগত জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্ক মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিবুর রহমান সেলিম রেজা বলেন, সফরকে সামনে রেখে নিউইয়র্কে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। প্রবাসীদের নিয়ে নাগরিক সভা আয়োজনের প্রস্তুতি থাকলেও সেটি শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়েছে। তবে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের কর্মসূচি থাকবে।
ফ্লোরিডা বিএনপির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ইমরানুল হক চাকলাদার বলেন, প্রবাসীরা দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে চান এবং দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
সব মিলিয়ে সময়ের হিসাবে সফরটি মাত্র পাঁচ দিনের হলেও জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্ক, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ—বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সরকারি সূচি অনুযায়ী ২২–২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে। (United Nations)
মন্তব্য করুন