সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হ্যাকারকে নিজে খুব বেশি কাজ করতে হয়নি। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এজেন্টগুলোকে নির্দেশনা দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন ওয়েবসাইটের দুর্বলতা খুঁজতে এবং সেগুলোতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাতে ব্যবহার করেছেন।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান নরফোর্জের প্রধান হুমকি গবেষক স্নোরে ফাগারল্যান্ড জানান, হ্যাকার পুরো প্রক্রিয়াটি এআইয়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। এআই এজেন্টগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ওয়েবসাইট পরীক্ষা করে দুর্বলতা শনাক্ত এবং সেগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে।
সোমবার প্রকাশের আগে রয়টার্সের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে ফাগারল্যান্ড জানান, তিনি ইন্টারনেটে ‘কেয়ার্ন’ নামের একটি ওপেন সোর্স এআই প্ল্যাটফর্মের অনিরাপদভাবে উন্মুক্ত সংস্করণ খুঁজছিলেন। সমস্যা সমাধানের জন্য তৈরি এই প্ল্যাটফর্মটি সাইবার অপরাধীদের মধ্যেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে তাঁর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
ফাগারল্যান্ডের দাবি, গত ২ অক্টোবর থেকে তিনি প্রায় ২৪টি ঘটনায় কেয়ার্নের ক্ষতিকর ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছেন। সাইবার অপরাধীরা যখন এআই টুল ব্যবহার করে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হামলা চালাচ্ছিল, তখন তিনি তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান।
প্রতিবেদনে চীনা ভাষাভাষী হ্যাকারের কথা উল্লেখ করা হলেও প্রথমে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি। পরে রয়টার্স হ্যাকারের কেয়ার্ন ব্যবহারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করে।
স্বয়ংক্রিয় এআই টুলের সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের মধ্যে এ ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি দেখিয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য এআই এজেন্টগুলো মানুষের সীমিত সরাসরি হস্তক্ষেপে জটিল সাইবার কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে পারে। এতে সাইবার অপরাধীদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ফাগারল্যান্ড বলেন, ‘আমরা এখন এক নতুন পৃথিবীতে বাস করছি।’
তাঁর পর্যবেক্ষণে থাকা হ্যাকারদের মধ্যে একজন বিপুল পরিমাণ ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করেছে। অন্য একজন এআই এজেন্ট ব্যবহার করে একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
তবে সবচেয়ে সক্রিয় ছিল চীনা ভাষাভাষী হ্যাকারটি। গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি এআই এজেন্ট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইটে হামলা চালানোর চেষ্টা করেন।
হ্যাকার এআই এজেন্টগুলোকে ১০০টিরও কম চীনা অক্ষরে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেখানে অনুপ্রবেশের কৌশল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দেওয়া ছিল। গত সপ্তাহের শেষ নাগাদ তাঁর এজেন্টগুলো ১ হাজার ২০০টিরও বেশি ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়।
ফাগারল্যান্ডের হিসাব অনুযায়ী, সফলভাবে অনুপ্রবেশের আগে দুর্বলতা খুঁজতে গড়ে প্রায় ২৩ ঘণ্টা কাজ করতে হয়েছে এআই এজেন্টগুলোকে। পুরো অভিযানে ডিপসিক ও অ্যানথ্রোপিকের ক্লড কোডের সমন্বিত ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন। তাঁর প্রাক্কলন অনুযায়ী, এআই ব্যবহারে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ডলার। সে হিসাবে প্রতিটি সফল অনুপ্রবেশে খরচ পড়েছে আনুমানিক ৫০ ডলার।
প্রায় তিন দশক ধরে সাইবার নিরাপত্তা খাতে কাজ করা ফাগারল্যান্ড জানান, ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সিস্টেমে প্রবেশের জন্য এআই এজেন্টগুলোর ব্যবহৃত কৌশল তাঁকে বিস্মিত করেছে।
একটি ঘটনায়, বড় একটি প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট-সংযুক্ত অ্যাপ্লিকেশনে দুর্বলতা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর এআই এজেন্টগুলো ডিজিটাল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো শনাক্ত করে। পরে তারা একটি উন্মুক্ত কন্ট্রোল প্যানেল খুঁজে পায় এবং এর ডেটা প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম দুর্বলতা শনাক্ত করে।
দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন প্রচেষ্টার পর ওই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সার্ভারকে বিভ্রান্ত করে ক্ষতিকর কমান্ড কার্যকর করাতে সক্ষম হয় এআই এজেন্টগুলো।
ফাগারল্যান্ড বলেন, এ ধরনের সমাধান বের করা মোটেও সহজ নয়। এটি কোনো সাধারণ শৌখিন হ্যাকারের কাজ হতে পারে না।
হামলার শিকার ডিয়ার জানিয়েছে, ঘটনার পর তারা প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে সংবেদনশীল তথ্য চুরি হওয়ার কোনো ইঙ্গিত তারা পায়নি।
শার্কনিনজা জানিয়েছে, আক্রান্ত ওয়েবসাইটটি ছিল তাদের একটি স্বতন্ত্র সাইট, যেখানে শুধু পণ্য-সহায়তাসংক্রান্ত তথ্য ছিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, হুমকিটি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
অন্যদিকে, কামিন্স জানিয়েছে, তৃতীয় পক্ষের একটি সরবরাহকারীর পরিচালিত ওয়েবসাইটে সম্ভাব্য সাইবার হামলার প্রতিবেদন তারা খতিয়ে দেখছে। আরও দুটি ছোট প্রতিষ্ঠানও হামলার শিকার হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে।
তবে অনুপ্রবেশের ঘটনায় ঠিক কী পরিমাণ তথ্য অননুমোদিতভাবে সংগ্রহ বা চুরি হয়েছে, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি।
কেয়ার্ন কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, তাদের প্ল্যাটফর্মটি উদ্ভাবনী মাল্টি-এজেন্ট প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, হ্যাকিং আক্রমণ চালানোর জন্য নয়। প্ল্যাটফর্মটি ক্ষতিকর সাইবার হামলায় ব্যবহৃত হলে তা তাদের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী বলেও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়ছে। কম খরচে দীর্ঘ সময় ধরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হামলা চালানোর সক্ষমতা ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্য করুন