গ্রাহকদের জন্য মোবাইল ফোনে কথা বলার খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। বর্তমানে নির্ধারিত ভয়েস কলের সর্বনিম্ন ট্যারিফ বা ‘ফ্লোর প্রাইস’ কমানোর বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে এক গ্রাহকের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানানো হয়। শুনানিতে টেলিযোগাযোগ সেবার মান, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, কলড্রপ, ভয়েস ও ডাটার দাম, ডাটা ক্যারি-ফরওয়ার্ড, সিম নিবন্ধন এবং এনইআইআরসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রাহকদের প্রশ্নের উত্তর দেন বিটিআরসির কর্মকর্তারা।
জামালপুর থেকে অংশ নেওয়া রকীব রায়হান কলরেট কমানোর পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের দাবি জানান।
জবাবে বিটিআরসি জানায়, বর্তমানে ভয়েস কলের সর্বনিম্ন রেট ৪৫ পয়সা এবং সর্বোচ্চ রেট ২ টাকা। গ্রাহকদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে সর্বনিম্ন রেট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে বিটিআরসির প্রকৌশল ও পরিচালনা বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিসুল আলম পারভেজ জানান, রোলআউটের বাধ্যবাধকতা পূরণের পাশাপাশি হাওর ও অন্যান্য দুর্গম এলাকায় নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে টেলিটক একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
গণশুনানিতে মাস্কিং ছাড়া আসা এসএমএসের কারণে স্প্যাম বার্তা শনাক্তে সমস্যা এবং বিদেশি ওটিপি পেতে বিলম্বের বিষয়টি তুলে ধরেন এক গ্রাহক।
বিটিআরসি জানায়, ধাপে ধাপে সব ধরনের বার্তাকে মাস্কিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে বিদেশি ওটিপি পেতে মাঝে মাঝে দেরি হতে পারে।
ডাটা প্যাকেজের বিভিন্ন শর্ত নিয়েও গ্রাহকদের প্রশ্ন ছিল। কমিশন জানায়, প্রতিটি প্যাকেজের শর্ত গ্রাহকদের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে মোবাইল অপারেটরদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখার বিষয়েও জানতে চান গ্রাহকেরা। বিটিআরসি জানায়, নেটওয়ার্ক সচল রাখার সক্ষমতা বাড়াতে একটি বিশেষ প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সারাদেশের মোবাইল টাওয়ারগুলোর অবস্থা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
মোবাইল টাওয়ার থেকে নির্গত তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিটিআরসি জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত টাওয়ারের বিকিরণের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। এসব পরিমাপে বিকিরণের মাত্রা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
গ্রাহকদের অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিটিআরসি জানায়, কলসেন্টার ১০০, ওয়েবসাইট ও জিআরএস প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অভিযোগ করা যায়।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কমিশনে ১৩ হাজার ৯টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ২৭৯টি অভিযোগ, অর্থাৎ ৮৬ দশমিক ৭০ শতাংশ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। তবে সব অভিযোগ দ্রুত সমাধান করাই কমিশনের লক্ষ্য বলে জানানো হয়েছে।
সেবার মান বা কোয়ালিটি অব সার্ভিস উন্নয়নের অংশ হিসেবে শিগগির বিটিআরসির ওয়েবসাইটে মাসভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
গণশুনানিতে বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেন জানান, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর সংশোধিত ২০২৬ সালের ৮৭ ধারা অনুযায়ী এখন থেকে প্রতি মাসে অন্তত একবার গণশুনানির আয়োজন করবে কমিশন।
এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সরাসরি তাদের সমস্যা, মতামত, পরামর্শ ও উদ্বেগ তুলে ধরতে পারবেন। শুনানিতে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো কার্য-পর্যবেক্ষণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
বিটিআরসি জানিয়েছে, এবারের গণশুনানিতে অংশ নিতে ১৭ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত অনলাইনে ২ হাজার ৯৯০ জন নিবন্ধন করেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৭ জন বিভিন্ন পেশার মানুষ, ৬৩৮ জন শিক্ষার্থী ও ১৭২ জন নারী ছিলেন।
নিবন্ধিত গ্রাহকদের প্রশ্নের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ট্যারিফ, ডাটার মেয়াদ, ডাটা ক্যারি-ফরওয়ার্ড, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, সিম নিবন্ধন, এনইআইআর ও টেলিযোগাযোগ সেবার মানসংক্রান্ত বিষয়।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০২৫ সালের গণশুনানিতে ১ হাজার ৭৫৬টি অভিযোগ ও প্রশ্ন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে বিটিআরসির আওতাভুক্ত ২২১টি বিষয় চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট বিভাগে সমাধানের জন্য পাঠানো হয়েছিল।
মন্তব্য করুন