মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে বাড়িটি থেকে ৮৫ জনকে আটকের পর এসব তথ্য সামনে এসেছে। গোয়েন্দা পুলিশ রাজধানীর আরও কয়েকটি এলাকায় ডিজে পার্টি ও জন্মদিন উদযাপনের আড়ালে মাদকের আসর বসানোর অভিযোগ পেয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের তিনতলা বাড়ি থেকে আটক ৮৫ জনকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। ডিবি পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. ইলিয়াস কবিরের তথ্য অনুযায়ী, আটক পুরুষদের প্রত্যেককে এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত এক মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। অন্যদিকে, আটক নারীদের প্রত্যেককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, আটক ব্যক্তিরা ১৯ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে বাড়িটিতে প্রবেশ করেন। পার্টিতে অংশ নেওয়ার আগে তাঁদের ইংরেজিতে লেখা একটি আমন্ত্রণবার্তা পাঠানো হয়েছিল। সেখানে অনুষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত ‘হাউস পার্টি ও রেভ’ হিসেবে উল্লেখ করে আগাম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়।
আমন্ত্রণবার্তায় বলা হয়েছিল, রাত ৯টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত গান ও নাচের আয়োজন থাকবে। পাশাপাশি বাড়িটি একজন পুলিশ ডিআইজির বলে উল্লেখ করে দাবি করা হয়, সেখানে পুলিশি অভিযানের ভয় নেই এবং নিরাপত্তার দায়িত্বেও পুলিশ সদস্যরা থাকবেন।
বার্তাটি কে, কখন এবং কীভাবে পাঠিয়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটি অনলাইন ভাড়ার প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। বাড়িটি দেখভালের জন্য মাহবুব আলম নামের এক ব্যক্তিকে কো-হোস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ আল জহির। এ ঘটনায় মাহবুব আলমসহ আরও তিন সহকারী কো-হোস্ট—সাদমান রিফাত, নাইমুর রহমান ও পরম গুহকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তকারীরা তাঁদের কাছ থেকে পার্টির আয়োজন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। এ ছাড়া জব্দ করা তিনটি মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাড়িটিতে মোট ছয়টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি কক্ষ অনলাইনে বুকিংয়ের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। প্রতিটি কক্ষে ১০ জনের থাকার ব্যবস্থা ছিল। এর বেশি অতিথি এলে জনপ্রতি অতিরিক্ত ৬০০ টাকা দিতে হতো। পাঁচটি কক্ষ রাত ৯টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ভাড়া নিতে খরচ হতো ১৮ হাজার ৫০০ টাকা।
পুলিশের দাবি, বাড়িটিতে আসা তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং পুলিশ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ব্যবসা ও ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। কেউ প্রথমবার, আবার কেউ নিয়মিত ওই পার্টিতে যোগ দিতেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযানের সময় বাড়ির সামনে ছয়টি বিলাসবহুল গাড়ি পাওয়া যায়। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে আইফোনসহ দামি মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
বাড়িটিতে নিয়মিত কারা আসতেন, তা জানতে জব্দ করা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাও নিয়মিত এসব পার্টিতে অংশ নিতেন।
মঙ্গলবার দুপুরে আব্দুল্লাহ আল জহিরকে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। বাড়িটি ভাড়া দেওয়া, পার্টির আয়োজন এবং পুরো ঘটনায় তাঁর ভূমিকা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
এদিকে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা ও তিনশ ফিট এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের আরও বাড়ি থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এসব বাড়িতে ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক সেবন ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট বাড়িগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তদন্তকারীরা এখন আমন্ত্রণবার্তার উৎস, পার্টির আয়োজক এবং নিয়মিত অতিথিদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
মন্তব্য করুন