সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এক লাখ ৭২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক লাখ ২০ হাজারই গেছেন সৌদি আরবে। অন্যদিকে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন, যাঁদের মধ্যে প্রায় এক হাজার এসেছেন সৌদি আরব থেকে।
ফিরে আসা নারী কর্মীদের নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর দাবি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেতন না পাওয়া এবং যৌন নিপীড়নের কারণে অনেক নারী দেশে ফিরতে বাধ্য হন।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম জানান, বিদেশ থেকে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসা নারীদের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফিরে আসা নারীদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাঁদের ৯০ শতাংশই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে দেশে ফিরেছেন।
সৌদি আরব শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সংস্কার করেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি প্রেস এজেন্সির এক প্রতিবেদনে গৃহকর্মী ও সমপর্যায়ের কর্মীদের নিয়োগসংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধনের কথা জানানো হয়।
সংশোধিত বিধি অনুযায়ী, নিয়োগকর্তারা কর্মীদের চুক্তিতে উল্লেখ নেই—এমন কাজ করতে বাধ্য করতে পারবেন না। তৃতীয় পক্ষের হয়ে কাজ করানো এবং স্বাস্থ্য, শারীরিক নিরাপত্তা বা মর্যাদার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করাও নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া মানসম্মত কর্মচুক্তি, মজুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা, বিমা কর্মসূচি, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং নির্যাতন বা বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে সৌদি সরকার। তবে এসব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহের মতে, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে ২০১৫ সালে গৃহকর্মী নিয়োগ নিয়ে করা চুক্তিতে নারী কর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়গুলো যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তাঁর ভাষ্য, অনেক নারীকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত দক্ষতা ছাড়াই সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। ফলে নিয়োগকর্তার বাসায় কাজের পরিবেশ, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অনেকে সংকটে পড়েছেন।
২০১৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী, দুই বছরের চুক্তিতে সৌদি আরবে যাওয়া নারী গৃহকর্মীদের মাসিক ৮০০ সৌদি রিয়াল বেতন পাওয়ার কথা ছিল। তাঁদের বিনা খরচে সৌদি আরবে যাওয়ার ব্যবস্থাও চুক্তিতে উল্লেখ ছিল। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার দাবি, অনেক কর্মী নির্ধারিত বেতন পাননি। বেতন চাইতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর সৌদি আরব ও বাংলাদেশের মধ্যে সাধারণ শ্রমিক নিয়োগ নিয়ে একটি চুক্তি সই হয়। এর লক্ষ্য ছিল কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা এবং কর্মী ও নিয়োগকর্তা—উভয়ের অধিকার সুরক্ষিত করা।
সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ শুধু বাংলাদেশের নয়। ২০২৬ সালের ৯ জুলাই প্রকাশিত অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে সৌদি আরবে ফিলিপাইনের নারী কর্মীদের অতিরিক্ত কাজ করানো, শোষণ, মর্যাদাহানিকর আচরণ এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনটিতে ১৯ জন নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তাঁদের কর্মপরিবেশ ও সুরক্ষার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এদিকে, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাও সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সুরক্ষা ও শ্রম অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। শ্রীলঙ্কার শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সরকার সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গৃহকর্মীদের উচ্চ বেতন, উন্নত জীবনযাত্রা এবং শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা করছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে সৌদি সরকারের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশটির বিদ্যমান বিধিবিধানের আওতায় গৃহকর্মীরা সুরক্ষিত এবং নির্যাতনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়।
সৌদি সরকারের দাবি, কর্মচুক্তি, মজুরি সুরক্ষা, বিমা, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং নির্যাতনের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের সুযোগের মাধ্যমে গৃহকর্মীদের সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে।
তবে অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় নেওয়া সংস্কার ও পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়ে সৌদি সরকারের কাছে পাঠানো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন ও চুক্তি প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। নিয়োগের আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, চুক্তি অনুযায়ী বেতন নিশ্চিত করা, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, দূতাবাসের কার্যকর সহায়তা এবং নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ কতটা কার্যকর হচ্ছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মন্তব্য করুন