সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বক্তব্যের পর এ বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, গুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমে ষড়যন্ত্র চলছে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও এসেছে। এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।
গত ১ অক্টোবর ফেনীতে এক জনসভায় তারেক রহমান বলেন, যারা অতীতে রাজপথে ছিলেন না, তারা স্বৈরাচারী শক্তির সঙ্গে আবারও এক হয়েছেন। ১৯৯১, ১৯৮৬ সাল এবং সর্বশেষ নির্বাচনেও তারা একসঙ্গে কাজ করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার বক্তব্যে জামায়াতকে ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
এর দুই দিন পর ঢাকায় বায়তুল মোকাররমের সামনে এক সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা জীবন দিয়েছেন। সেই সংগঠনকে ‘গুপ্ত’ বলার সমালোচনাও করেন তিনি।
গত ১৫ অক্টোবর সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ নেতা নুরুল হক নুরও অভিযোগ করেন, জামায়াত বিভিন্ন প্রক্সি সংগঠন তৈরি করে রাজনীতিতে ব্যবহার করছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জামায়াতের বক্তব্যও রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের নেতাদের প্রকাশ্যে আসা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সে সময় অভিযোগ ওঠে, শিবিরের কিছু নেতা আগে গোপনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব অভিযোগ করেন, ছাত্রশিবির পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগঠনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ দাবি করেন, শিবির নিয়মিত বিভিন্ন শাখার কমিটি গঠন করে এবং সেগুলোর তথ্য সংগঠনের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। তার নিজের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তিনি নাকচ করেছেন।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, গোপন বা আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি বাংলাদেশে নতুন নয়। অতীতে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলো গোপনে কার্যক্রম পরিচালনা করত। তবে সময়ের সঙ্গে এর ধরন পরিবর্তিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরিনের মতে, বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একে অপরকে সন্দেহ করার প্রবণতা বেড়েছে। ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়, অতীতের কর্মকাণ্ড কিংবা নতুন করে কোনো দলে যোগ দেওয়ার ঘটনাকেও অনেক সময় ‘গুপ্ত রাজনীতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
তার মতে, এ ধরনের অভিযোগ দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি নিজ নিজ দলের অভ্যন্তরেও সন্দেহ ও বিভাজন তৈরি করছে।
বিএনপির নেতারা বলছেন, সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে জামায়াতের কর্মকাণ্ডের মধ্যে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা রয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুকের অভিযোগ, সংস্কারের বিষয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে গুপ্তভাবে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এসব অভিযোগের সমালোচনা করে বলেছেন, জনগণের জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে দৃষ্টি সরাতেই এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ বিতর্ক এখন আর শুধু ছাত্ররাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে বিষয়টি জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বিতর্ক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও বাড়াচ্ছে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মন্তব্য করুন