ক্যামেরা ট্র্যাপ, স্মার্ট পেট্রোলিং ও জনসচেতনতায় কমেছে বাঘ হত্যা; সর্বশেষ জরিপে সুন্দরবনে ১২৫ বাঘের উপস্থিতি
একসময় সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার শিকার ছিল এক ধরনের ‘সাহসিকতার প্রতীক’। সংঘবদ্ধ শিকারিরা অস্ত্র নিয়ে বনে ঢুকে বাঘ হত্যা করে ফিরে আসত। কার্যকর নজরদারি ও সচেতনতার অভাবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের এই মহামূল্যবান প্রাণীটি তখন ছিল চরম হুমকির মুখে।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে পরিস্থিতি। কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। কমেছে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪ সালের বাঘ শুমারিতে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালে ১১৪টি। ধারাবাহিকভাবে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সফলতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস উপলক্ষে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা শুধু একটি বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তা।
বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণের বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে। ওই সময় সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে বাঘ হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়।
তবে বাঘ সংরক্ষণের এই পথ সহজ ছিল না। গত প্রায় আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে বিভিন্ন কারণে বহু বাঘের মৃত্যু হয়েছে। চোরা শিকারি, বনদস্যু, মানুষের সংঘাত, বার্ধক্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছে অনেক বাঘ। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন শত শত বনজীবী।
বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। স্মার্ট পেট্রোলিং, নিয়মিত টহল, ড্রোন ও ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে মানুষ-বাঘ সংঘাতও কমেছে।
এরই মধ্যে চলতি বছরের শুরুতে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়া একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার পর আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণে নির্দিষ্ট এলাকায় স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
বিশ্ব বাঘ দিবসের আগে সুন্দরবনে বাঘের উপস্থিতির একাধিক দৃশ্যও সামনে এসেছে। পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের কাছে এবং শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যে নদী সাঁতরাতে দেখা গেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বনকর্মীদের ধারণ করা এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
পূর্ব সুন্দরবনের কর্মকর্তারা বলছেন, নদী-খাল পেরিয়ে বাঘের চলাচল তাদের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাবারের সন্ধান, এলাকা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে তারা নিয়মিত সাঁতার কাটে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহলমুক্ত। এতে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে বিচরণ করার সুযোগ পাচ্ছে।
পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় শুধু আইন নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আবাসস্থল রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের আশা, সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। কারণ বাঘ বাঁচলে বাঁচবে সুন্দরবন, আর সুন্দরবন টিকে থাকলে নিরাপদ থাকবে উপকূলীয় পরিবেশ।
মন্তব্য করুন