জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির ১০ম বৈঠকে অংশ নিয়ে সংবিধান সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বয়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অবদান রাখা ইব্রাহীম নিরব।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সাবেক সমন্বয়কের পক্ষ থেকে বৈঠক বয়কটের আহ্বান জানানো হলেও তাতে সাড়া না দিয়ে আলোচনায় অংশ নেন তিনি। কেন বয়কটের আহ্বান উপেক্ষা করে বৈঠকে যোগ দিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ইব্রাহীম নিরব বলেন, বয়কটের আহ্বানকারীদের মতামতের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে তাঁর দাবি, বয়কটকারীদের অনেকেই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে দলীয় অবস্থান থেকে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ইব্রাহীম নিরবের ভাষ্য, সংবিধান সংশোধনের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুধু আলোচনার বাইরে থেকে দাবি জানিয়ে প্রত্যাশিত পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও রাজবন্দীদের ত্যাগ ও প্রত্যাশা সংবিধানে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ এবং লিখিত ও প্রকাশ্য অবস্থান তুলে ধরা প্রয়োজন।
বৈঠকে তিনি সংবিধান সংশোধন নিয়ে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে সংবিধানে বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয় ও সংজ্ঞা যথাযথ মর্যাদায় নিশ্চিত করা, জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা প্রদান এবং একই সঙ্গে গণহত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত রাখা।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ সীমিত করা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং এসব প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের সুরক্ষা এবং জুলাই সনদের দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর বাস্তবায়নের বিষয়টিও তাঁর প্রস্তাবে গুরুত্ব পায়। শিক্ষাবিষয়ক আলোচনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বাড়ানোর দাবি জানান তিনি। তাঁর মতে, বাজেট বৃদ্ধি করা গেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আরও মানসম্মত ও উন্নত শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে।
বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকারও কঠোর সমালোচনা করেন ইব্রাহীম নিরব। তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর জুলাই সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মতামত যথাযথভাবে গ্রহণ করা হয়নি। তাঁর ভাষায়, শিক্ষার্থীদের উপেক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়।
একই সঙ্গে দীর্ঘ ১৭ বছর পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দের মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখায় ধন্যবাদ জানান তিনি।
ইব্রাহীম নিরব মনে করেন, সংবিধান কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি দেশের সব নাগরিকের। তাই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক পক্ষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও আত্মত্যাগের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না বলেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত না হলে তিনি আলোচনার টেবিলের পাশাপাশি রাজপথেও এর জবাব চাইবেন।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনায় অংশ নিয়ে ইব্রাহীম নিরবের অবস্থান নতুন করে সামনে এনেছে সংবিধান সংস্কার, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের প্রশ্ন।
মন্তব্য করুন