ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালকে ঘিরে দালালচক্র ও আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক নির্ধারিত কর্মঘণ্টায় সরকারি হাসপাতালে রোগী না দেখে আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখছেন। অন্যদিকে, হাসপাতাল চত্বরে সক্রিয় দালালচক্র দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের নানা প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে বাইরের ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মিটফোর্ড হাসপাতালের আশপাশের মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ গজের মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি এবং কোতোয়ালি-চকবাজার এলাকায় অর্ধশতাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন গেটের আশপাশেই এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা নেই।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, কিছু ক্লিনিকের প্রচারসামগ্রী ও চিকিৎসক তালিকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরিচয় দেখিয়ে রোগীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করার পর দালালদের মাধ্যমে তাদের বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
সরেজমিনে বেলা ১টা ২০ মিনিটে মিটফোর্ড হাসপাতালের বহির্বিভাগের অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ তানভীরকে হাসপাতালের পাশের ‘ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালে’ রোগী দেখতে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তার সরকারি হাসপাতালে ডিউটিতে থাকার কথা ছিল। একই সময়ে শিশু বিভাগের চিকিৎসক প্রদীপ মালাকারসহ মেডিসিন বিভাগের আরও কয়েকজন চিকিৎসককে ওই ক্লিনিকে যেতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দালালরা রোগী সংগ্রহ করে চিকিৎসকদের ফোন দিলেই তারা বিভিন্ন অজুহাতে সরকারি হাসপাতালের ডিউটি ছেড়ে আশপাশের ক্লিনিকে চলে যান। হাসপাতালের ভেতরেও রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার জন্য দালালরা অবস্থান করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনই এক দালালের খপ্পরে পড়েন মুন্সীগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ৭৫ বছর বয়সী আব্দুল মজিদ। পিত্তথলিতে পাথর ও তলপেটের ব্যথা নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে আসার পর টিকিটের লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় কয়েকজন দালাল তাকে কম খরচে দ্রুত চিকিৎসার প্রলোভন দেখান। পরে তাদের কথায় বিশ্বাস করে হাসপাতালের বাইরে একটি ক্লিনিকে যান তিনি।
মজিদের অভিযোগ, সেখানে নেওয়ার পর একের পর এক পরীক্ষা করানোর কথা বলে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। সব টাকা শেষ হয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পাননি তিনি। মজিদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসার আশায় এসেছিলেন, কিন্তু দালালরা তাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষার নামে সব টাকা নিয়ে নিয়েছে। এমনকি বাড়ি ফেরার ভাড়াও তার কাছে নেই।
স্থানীয়দের দাবি, মিটফোর্ড হাসপাতালের ভিড় ও চিকিৎসকদের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে প্রতিদিন বহু রোগীকে আশপাশের ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছে দালালচক্র। সেখানে কমিশনের বিনিময়ে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা করানো এবং অতিরিক্ত বিল ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর নেতা ও নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অফিস সময়ে সরকারি দায়িত্ব পালন না করে বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখা আইনবিরোধী। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এইচ এম এ রুস্তম বলেন, অফিস চলাকালীন কোনো চিকিৎসক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখলে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।
হাসপাতালে চুরি ও দালালদের তৎপরতা প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন, দালাল ও চুরি প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চলছে। অনেক সময় চোররা রোগীর স্বজনের পরিচয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়। তবে চোরদের ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রোগী ও স্বজনদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
মন্তব্য করুন