নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জুলাই ২০২৬, ৩:২৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ২০ জন

সুন্দরবনে ফিরছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সুদিন, ১০ বছরে বেড়েছে বাঘের সংখ্যা

ক্যামেরা ট্র্যাপ, স্মার্ট পেট্রোলিং ও জনসচেতনতায় কমেছে বাঘ হত্যা; সর্বশেষ জরিপে সুন্দরবনে ১২৫ বাঘের উপস্থিতি

 

একসময় সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার শিকার ছিল এক ধরনের ‘সাহসিকতার প্রতীক’। সংঘবদ্ধ শিকারিরা অস্ত্র নিয়ে বনে ঢুকে বাঘ হত্যা করে ফিরে আসত। কার্যকর নজরদারি ও সচেতনতার অভাবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের এই মহামূল্যবান প্রাণীটি তখন ছিল চরম হুমকির মুখে।

তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে পরিস্থিতি। কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। কমেছে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪ সালের বাঘ শুমারিতে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালে ১১৪টি। ধারাবাহিকভাবে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সফলতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস উপলক্ষে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা শুধু একটি বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তা।

বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণের বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে। ওই সময় সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে বাঘ হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়।

তবে বাঘ সংরক্ষণের এই পথ সহজ ছিল না। গত প্রায় আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে বিভিন্ন কারণে বহু বাঘের মৃত্যু হয়েছে। চোরা শিকারি, বনদস্যু, মানুষের সংঘাত, বার্ধক্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছে অনেক বাঘ। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন শত শত বনজীবী।

বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। স্মার্ট পেট্রোলিং, নিয়মিত টহল, ড্রোন ও ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে মানুষ-বাঘ সংঘাতও কমেছে।

এরই মধ্যে চলতি বছরের শুরুতে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়া একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার পর আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণে নির্দিষ্ট এলাকায় স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

বিশ্ব বাঘ দিবসের আগে সুন্দরবনে বাঘের উপস্থিতির একাধিক দৃশ্যও সামনে এসেছে। পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের কাছে এবং শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যে নদী সাঁতরাতে দেখা গেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বনকর্মীদের ধারণ করা এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

পূর্ব সুন্দরবনের কর্মকর্তারা বলছেন, নদী-খাল পেরিয়ে বাঘের চলাচল তাদের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাবারের সন্ধান, এলাকা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে তারা নিয়মিত সাঁতার কাটে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহলমুক্ত। এতে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে বিচরণ করার সুযোগ পাচ্ছে।

পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় শুধু আইন নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আবাসস্থল রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের আশা, সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। কারণ বাঘ বাঁচলে বাঁচবে সুন্দরবন, আর সুন্দরবন টিকে থাকলে নিরাপদ থাকবে উপকূলীয় পরিবেশ।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এক কর্মকর্তার হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, আইসিটি বিভাগে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন

গাজীপুরের পূবাইলে সাংবাদিকের পৈত্রিক জমি দখলের অভিযোগ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

জবি বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের যাত্রা শুরু, আহ্বায়ক দিদার, সদস্য সচিব রাতুল

বাড়তি বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ তাসনিম জারার, ‘হুমকি নয়, গ্রাহকদের জবাব দিন’

ইরানের প্রেসিডেন্টের ‘পদত্যাগ’ গুঞ্জন উড়িয়ে দিল তেহরান, ‘মিথ্যা’ বলছে প্রেসিডেন্টের দপ্তর

জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৬ আগস্ট থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

জবিতে ছাত্রদল-জকসু-ছাত্রশক্তির সংঘর্ষ, ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন

‘আমার বাসার বিদ্যুৎ বিলও অস্বাভাবিক বেড়েছে’: আজহারীর অভিযোগ, ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান

সৌদি যুবরাজের কূটনৈতিক উদ্যোগে ইরানে নতুন হামলা স্থগিত ট্রাম্পের, আলোচনার সম্ভাবনা জোরালো

১০

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ ঘিরে দেশজুড়ে র‌্যাবের বিশেষ নিরাপত্তা: নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা ও সাইবার পেট্রোলিং জোরদার

১১

বন্যাদুর্গত চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর সফর ৯ আগস্ট: ত্রাণ বিতরণ ও ১০০ গৃহহারা পরিবারের হাতে নতুন বাড়ির চাবি

১২

শতাধিক প্রাণহানির মধ্যেও ‘মার্চ টু ঢাকা’র প্রস্তুতি: রাজধানীমুখী জনস্রোতে আন্দোলনের চূড়ান্ত অধ্যায়

১৩

গ্রিসে দাবানল নেভানোর অভিযানে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ, নিহত ২ ক্রু সদস্য

১৪

‘৫ আগস্ট ঘিরে নাশকতার সক্ষমতা নেই আ. লীগের’, বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

১৫

‘চীন সবসময় বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু থাকবে’, ঢাকায় রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের অঙ্গীকার

১৬

‘ছাগলকাণ্ডে’ আলোচিত মতিউরের বিরুদ্ধে চার্জগঠন, দুর্নীতি মামলায় বিচার শুরু

১৭

অভ্যুত্থানের পর প্রথমবার বিদেশি প্রতিনিধির সঙ্গে সু চির সাক্ষাৎ, স্বাস্থ্য নিয়েও বাড়ছে নজর

১৮

অবশেষে বিয়ের পিঁড়িতে রোনালদো-জর্জিনা, মাদেইরায় বসছে জমকালো আয়োজন

১৯

হরমুজ ইস্যুতে আজ থেকেই নতুন দফার আলোচনা, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা আপাতত স্থগিত: ট্রাম্প

২০