৪ আগস্ট দেশজুড়ে সংঘর্ষে নিহত ১০১ জন; কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেও ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ সফল করতে ঢাকার পথে হাজারো মানুষের যাত্রা।
ঢাকা | ৪ আগস্ট (৩৫ জুলাই): শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে ঘিরে ৪ আগস্ট দিনভর উত্তাল ছিল দেশ। সহিংস সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির মধ্যেও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শ্রমিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ রাজধানীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।
প্রথমে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দিলেও, চলমান সহিংসতা ও বাড়তে থাকা প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শে কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করে। আন্দোলনের নেতাদের ভাষ্য ছিল, কর্মসূচি বিলম্বিত হলে আন্দোলন আরও বড় দমন-পীড়নের মুখে পড়তে পারে।
রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে দেশজুড়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠনের আহ্বান জানান। একই দিনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেনাবাহিনীকে ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং জনগণকে রাজপথে নেমে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, সরকারের পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
এদিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ শেখ হাসিনার পদত্যাগ, শিক্ষক, বিচারক, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনসহ পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন।
দিনভর সংঘর্ষের পর সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিহতদের মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন আন্দোলনকারীরা। মিছিলটি শাহবাগে পৌঁছালে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
৪ আগস্ট দুপুরের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারদলীয় সমর্থক ও পুলিশের সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় ১২ জনসহ অন্তত ২০ জেলায় মোট ১০১ জন নিহত হন এবং আহত হন অসংখ্য মানুষ। নিহতদের মধ্যে সিরাজগঞ্জে ২২, লক্ষ্মীপুরে ১১, ফেনীতে ৮, নরসিংদী ও সিলেটে ৬ জন করে প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া রংপুর, বগুড়া, পাবনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, মাগুরা, শেরপুর, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, হবিগঞ্জ, ভোলা, বরিশাল ও কক্সবাজারেও হতাহতের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাজধানী, বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা সদর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং শিল্পাঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে। একই সঙ্গে ফোর-জি মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ এবং ৫ আগস্ট থেকে টানা তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে এসব পদক্ষেপের পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
এদিন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নিন্দা জানিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির দাবি জানায়।
৪ আগস্টের এই রক্তক্ষয়ী দিন শেষ হলেও আন্দোলনের গতি থেমে থাকেনি। শতাধিক প্রাণহানি, কারফিউ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও সারা দেশ থেকে মানুষের রাজধানীমুখী যাত্রা অব্যাহত থাকে, যা পরদিনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির জন্য এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
মন্তব্য করুন