নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ অগাস্ট ২০২৬, ৪:১২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ১১ জন

হাসিনার পতনের আগের ৭২ ঘণ্টা: এক দফা আন্দোলন থেকে ক্ষমতার পালাবদলের শেষ অধ্যায়

২ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট—সমাবেশ, অসহযোগ আন্দোলন, ‘মার্চ টু ঢাকা’ ও শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ; উত্তাল সেই তিন দিনের ঘটনাপ্রবাহ।

 

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রূপ নেয় সরকারবিরোধী এক দফা আন্দোলনে। ২ আগস্ট পর্যন্তও অনেকের ধারণার বাইরে ছিল যে, এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দাবিতে পরিণত হবে। তবে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক ঘটনাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তৈরি করে এক নাটকীয় অধ্যায়।

২ আগস্ট: আন্দোলনের গতি আরও তীব্র

জুলাইয়ের শেষ দিকে আন্দোলন যখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ২ আগস্ট ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।

২ আগস্ট ইউনিসেফ এক বিবৃতিতে কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় শিশু হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই দিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণমিছিল কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হন। এদিন আন্দোলনের সমন্বয়করা জানান, তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও রেকর্ড করানো হয়েছিল।

সেদিনই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৩ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিল এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি ‘দ্রোহ যাত্রা’ নামে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়।

৩ আগস্ট: এক দফা দাবির ঘোষণা

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত বিশাল সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করে।

আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার আর ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই এবং পদত্যাগের পাশাপাশি বিচারও দাবি করেন তারা।

এদিন শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভবনের দরজা খোলা। তবে আন্দোলনের সমন্বয়করা সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে জানান, গুলি ও সহিংসতার পর আর সংলাপের সুযোগ নেই।

একই দিনে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়, যার তারিখ পরে ৬ আগস্ট থেকে এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়।

৪ আগস্ট: অসহযোগ আন্দোলন ও সংঘর্ষ

৪ আগস্ট সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের খবর আসে। এদিন মোবাইল ফোর-জি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হন। এর মধ্যে পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।

সরকারের পক্ষ থেকে সহিংসতাকে ‘নাশকতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং সন্ধ্যা থেকে কারফিউ জারি করা হয়।

এদিকে আন্দোলনের নেতারা ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়ে সারাদেশের মানুষকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান।

৫ আগস্ট: ক্ষমতার পালাবদল

৫ আগস্ট সকালে কারফিউ চললেও ঢাকার বিভিন্ন সড়কে মানুষের ঢল নামে। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ রাজধানীতে আসতে থাকে।

একপর্যায়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশত্যাগ করেছেন। পরে জানা যায়, সামরিক বাহিনীর একটি উড়োজাহাজে করে তিনি ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন।

দুপুরের পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন। বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।

তিনি বলেন, জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সেনাবাহিনী দেশের স্বার্থে দায়িত্ব পালন করবে।

এরপর গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মানুষের প্রবেশের ঘটনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

সেদিন রাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে জানান, দ্রুত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে এবং জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে।

এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা

কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করে।

এই সময়ের সহিংসতায় সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৮০০-এর বেশি মানুষ নিহত হওয়ার কথা বলা হয়। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্টে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

২ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট—মাত্র ৭২ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে স্থান করে নেয়।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘অহেতুক ইস্যুতে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চলছে’—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

‘ষড়যন্ত্রকারীরা আপনার চারপাশেই’—প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করলেন অলি আহমদ

‘দেশে আসুন, দেখা হবে রাজপথে’—শেখ হাসিনার উদ্দেশে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির বার্তা

‘আরেকটি বিপ্লব আসন্ন, প্রস্তুত থাকুন’—দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের

হাসিনার পতনের আগের ৭২ ঘণ্টা: এক দফা আন্দোলন থেকে ক্ষমতার পালাবদলের শেষ অধ্যায়

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ, আহত ১০; ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন

‘জুলাই জাদুঘর নির্মাণ ছিল যুদ্ধের মতো কঠিন’, স্মৃতিচারণে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্টের অভিযোগ, গ্রেপ্তার এনসিপির সাবেক নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীর

৭ হাজার মুক্তার রাজকীয় গাউনে মুগ্ধ করলেন ঐশ্বরিয়া, কান ২০২৬-এর অদেখা লুক ভাইরাল

হরমুজ প্রণালি খুলতে বুধবারের মধ্যেই সমঝোতার আশাবাদ যুক্তরাষ্ট্রের, তেলের বাজারে স্বস্তির প্রত্যাশা

১০

‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান গণমানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়’—ড. মুহাম্মদ ইউনূস

১১

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণে নতুন অধ্যায়, ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

১২

এক কর্মকর্তার হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, আইসিটি বিভাগে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন

১৩

গাজীপুরের পূবাইলে সাংবাদিকের পৈত্রিক জমি দখলের অভিযোগ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

১৪

জবি বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের যাত্রা শুরু, আহ্বায়ক দিদার, সদস্য সচিব রাতুল

১৫

বাড়তি বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ তাসনিম জারার, ‘হুমকি নয়, গ্রাহকদের জবাব দিন’

১৬

ইরানের প্রেসিডেন্টের ‘পদত্যাগ’ গুঞ্জন উড়িয়ে দিল তেহরান, ‘মিথ্যা’ বলছে প্রেসিডেন্টের দপ্তর

১৭

জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৮

৬ আগস্ট থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

১৯

জবিতে ছাত্রদল-জকসু-ছাত্রশক্তির সংঘর্ষ, ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন

২০