২ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট—সমাবেশ, অসহযোগ আন্দোলন, ‘মার্চ টু ঢাকা’ ও শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ; উত্তাল সেই তিন দিনের ঘটনাপ্রবাহ।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রূপ নেয় সরকারবিরোধী এক দফা আন্দোলনে। ২ আগস্ট পর্যন্তও অনেকের ধারণার বাইরে ছিল যে, এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দাবিতে পরিণত হবে। তবে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক ঘটনাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তৈরি করে এক নাটকীয় অধ্যায়।
জুলাইয়ের শেষ দিকে আন্দোলন যখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ২ আগস্ট ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।
২ আগস্ট ইউনিসেফ এক বিবৃতিতে কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় শিশু হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই দিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণমিছিল কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হন। এদিন আন্দোলনের সমন্বয়করা জানান, তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও রেকর্ড করানো হয়েছিল।
সেদিনই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৩ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিল এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি ‘দ্রোহ যাত্রা’ নামে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়।
৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত বিশাল সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করে।
আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার আর ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই এবং পদত্যাগের পাশাপাশি বিচারও দাবি করেন তারা।
এদিন শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভবনের দরজা খোলা। তবে আন্দোলনের সমন্বয়করা সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে জানান, গুলি ও সহিংসতার পর আর সংলাপের সুযোগ নেই।
একই দিনে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়, যার তারিখ পরে ৬ আগস্ট থেকে এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়।
৪ আগস্ট সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের খবর আসে। এদিন মোবাইল ফোর-জি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হন। এর মধ্যে পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
সরকারের পক্ষ থেকে সহিংসতাকে ‘নাশকতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং সন্ধ্যা থেকে কারফিউ জারি করা হয়।
এদিকে আন্দোলনের নেতারা ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়ে সারাদেশের মানুষকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান।
৫ আগস্ট সকালে কারফিউ চললেও ঢাকার বিভিন্ন সড়কে মানুষের ঢল নামে। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ রাজধানীতে আসতে থাকে।
একপর্যায়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশত্যাগ করেছেন। পরে জানা যায়, সামরিক বাহিনীর একটি উড়োজাহাজে করে তিনি ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন।
দুপুরের পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন। বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।
তিনি বলেন, জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সেনাবাহিনী দেশের স্বার্থে দায়িত্ব পালন করবে।
এরপর গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মানুষের প্রবেশের ঘটনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
সেদিন রাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে জানান, দ্রুত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে এবং জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে।
কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করে।
এই সময়ের সহিংসতায় সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৮০০-এর বেশি মানুষ নিহত হওয়ার কথা বলা হয়। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্টে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
২ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট—মাত্র ৭২ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে স্থান করে নেয়।
মন্তব্য করুন