কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে ব্যাংক অব আমেরিকার বিরুদ্ধে করা ৭ কোটি ২৫ লাখ ডলারের মামলায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘জেন ডো’ নামে পরিচিত ছিলেন অন্যতম প্রধান বাদী। এবার প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসেছে তার পরিচয় ও ছবি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা গেছে, ওই নারী হলেন ৩৭ বছর বয়সী জুলিয়া মলচানোভা। প্রতিবেদনে তিনি তুলে ধরেছেন, মাত্র ২২ বছর বয়সে কীভাবে এপস্টেইনের সংস্পর্শে এসে যৌন নির্যাতন ও নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে কীভাবে সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসেন।
২০১১ সালে নিউইয়র্কের একটি রাস্তায় এপস্টেইনের সঙ্গে আকস্মিক পরিচয় হয় রাশিয়ার তরুণ ডিজাইন শিক্ষার্থী মলচানোভার। সে সময় তিনি খুব সামান্য ইংরেজি জানতেন। এপস্টেইন তাকে নিউইয়র্কের ফ্যাশন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ভর্তি হতে সহায়তার প্রস্তাব দেন।
মলচানোভার দাবি, সেই প্রস্তাবের আড়ালেই শুরু হয় তার ওপর যৌন নির্যাতন এবং এমন এক দুঃস্বপ্ন, যা তার জীবনের বহু বছরকে প্রভাবিত করে। তার অভিযোগ, এপস্টেইন ধীরে ধীরে তার ব্যক্তিগত জীবনের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
মলচানোভার ভাষ্য অনুযায়ী, এপস্টেইন তার পোশাক, চুলের দৈর্ঘ্য, চিকিৎসক নির্বাচন, কার সঙ্গে সময় কাটাবেন এবং কীভাবে অর্থ ব্যয় করবেন—এসব বিষয়েও হস্তক্ষেপ করতেন। এমনকি তার অজান্তে তার নামে একটি কোম্পানি খোলা হয়েছিল এবং ওই কোম্পানির মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করা হলেও সেগুলো সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না বলে দাবি করেন।
পরবর্তী সময়ে মলচানোভা ‘জেন ডো’ নামে একটি শ্রেণি-অ্যাকশন মামলার প্রধান বাদী হন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, এপস্টেইনের যৌন পাচার কার্যক্রমে ব্যবহৃত আর্থিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে সতর্কসংকেত থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক অব আমেরিকা তাকে সহযোগিতা করেছিল।
ব্যাংক অব আমেরিকা অবশ্য কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য ৭ কোটি ২৫ লাখ ডলার দিতে সম্মত হয়েছে ব্যাংকটি। এই অর্থ এপস্টেইনের নির্যাতনের শিকার কয়েক ডজন ব্যক্তির মধ্যে বিতরণ করা হবে।
এপস্টেইনকে দীর্ঘদিন আইনের আওতার বাইরে থাকতে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মলচানোভা। তার অভিযোগ, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নির্যাতনের ঘটনায় এপস্টেইন আগেও আইনের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এরপরও তিনি বাইরে থাকার সুযোগ পান এবং পরবর্তীতে আরও নারীর জীবনে প্রবেশ করেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে মলচানোভা বলেন, ‘লোকটির জেলে থাকার কথা ছিল। আমাদের ব্যর্থ করেছে পুরো ব্যবস্থাই।’
৭ কোটি ২৫ লাখ ডলারের এই নিষ্পত্তিকে এপস্টেইনের ভুক্তভোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অর্থ দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত যৌন পাচার কেলেঙ্কারির সব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
বিশেষ করে বিপুল অর্থ ও প্রভাবের অধিকারী একজন অভিযুক্ত যৌন অপরাধী কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে নিজের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন—সে প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে।
মলচানোভার অভিজ্ঞতা এপস্টেইন কেলেঙ্কারির পেছনে থাকা মানবিক ট্র্যাজেডির দিকটিও সামনে এনেছে। তার অভিযোগ অনুযায়ী, এপস্টেইন একপর্যায়ে তার শরীর, অর্থ ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণ করতেন; এমনকি তার ডাকে সাড়া দিতে গেলেও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পেতে হতো।
মন্তব্য করুন