সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে নতুন কোনো শক্তির মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই চুক্তি ভবিষ্যতে ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক শক্তির বাইরে একটি সম্ভাব্য ‘তৃতীয় অক্ষ’-এর ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে বাস্তবে এই জোট কতটা কার্যকর হবে এবং প্রয়োজনে এক দেশ অন্য দেশের হয়ে যুদ্ধে নামবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
শুক্রবার সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স প্যাক্ট’ নামে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। এটি গত বছর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অনুরূপ একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির ধারাবাহিকতা।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে, নাকি তিন দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
চুক্তিতে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে এখনও যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কিলোওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আল-জাজিরাকে বলেন, চুক্তিতে যদি এক দেশের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়, তাহলে এর বাস্তব অর্থ নির্ভর করবে চুক্তির ভাষা ও প্রয়োগের ওপর। আক্রান্ত দেশের পক্ষে অন্য দুই দেশকে অবশ্যই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে—এমন নিশ্চয়তা এতে নাও থাকতে পারে।
তিন দেশের জন্য সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকিও কাল্পনিক নয়। পাকিস্তান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িত। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গেও কয়েক দিন ধরে সংঘাতে জড়িয়েছিল দেশটি।
অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরবও ইরান ও তেহরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর হামলার হুমকির মুখে পড়েছে।
তুরস্কও দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভেতরে ও বাইরে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে আঙ্কারার উত্তেজনাও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই তিন দেশের কোনো একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি কি অন্য দুই দেশকেও সেই সংঘাতে টেনে আনবে?
গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলবিরোধী হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে।
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কয়েক দশকের উত্তেজনাও সরাসরি আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এর প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করছে।
অনেক দেশই পুরোনো বিরোধ ও মতপার্থক্য কিছুটা পাশে সরিয়ে বাস্তববাদী কৌশল গ্রহণ করছে। পারস্পরিক হুমকি মোকাবিলায় সহযোগিতাকে তারা আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তুরস্ক ও সৌদি আরবের সম্পর্কের পরিবর্তন এর অন্যতম উদাহরণ।
২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে হত্যার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে গভীর সংকটে ফেলেছিল। দীর্ঘ সময় রিয়াদ ও আঙ্কারার মধ্যে দূরত্ব বজায় থাকলেও ২০২২ সালের দিকে দুই দেশ পুরোনো বিরোধ পেছনে ফেলে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে এগিয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগই পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো দেশগুলোকে পরস্পরের আরও কাছে আসতে উৎসাহিত করেছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে তিন দেশের জন্য একটি কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা বা ‘ডিটারেন্স’ তৈরি করা।
আল-জাজিরার প্রতিবেদক ওসামাহ বিন জাভিদের মতে, তিন দেশই এই জোটে ভিন্ন ধরনের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা নিয়ে আসছে।
পাকিস্তানের রয়েছে যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী, বড় ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদের সক্ষমতা এবং পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানই একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।
তুরস্ক ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দেশটির রয়েছে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা।
অন্যদিকে সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি। ফলে তিন দেশের সামরিক, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সক্ষমতা একসঙ্গে কাজে লাগানো গেলে নতুন জোটটি উল্লেখযোগ্য শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তাকে।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও তুরস্ক নিজেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি আরও অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। ফলে বিভিন্ন দেশ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে—এমন ধারণা সৌদি আরবসহ অন্য দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ কারণে নতুন জোটকে শুধু সামরিক সহযোগিতা হিসেবে নয়, যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থার বিকল্প খোঁজার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক চুক্তিটিকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোট হিসেবে উপস্থাপন করতে সতর্ক রয়েছে। তারা কোনো বহিরাগত শক্তিকে সরাসরি প্রতিপক্ষ হিসেবেও চিহ্নিত করেনি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তিন দেশের নিরাপত্তা হিসাবের মধ্যে ইসরায়েল ও ইরান—দুই দেশই গুরুত্বপূর্ণ।
ওসামাহ বিন জাভিদের মতে, তিন দেশের জন্যই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বড় হুমকি ইসরায়েল। এরপর রয়েছে ইরান, বিশেষ করে তেহরানের হামলার পর সৌদি আরবের ক্ষেত্রে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সম্প্রতি সম্ভাব্য একটি ‘সুন্নি অক্ষ’ গড়ে ওঠার ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছেন। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এ ধরনের বক্তব্য উল্টো পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলতে পারে।
মক্কা প্রতিরক্ষা জোট ভবিষ্যতে আরও বড় হতে পারে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মিসর, কাতার, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
তবে নতুন সদস্য যুক্ত করা সহজ হবে না। প্রতিটি দেশের নিজস্ব স্বার্থ ও নিরাপত্তা অগ্রাধিকার রয়েছে।
সিরিয়া দীর্ঘ যুদ্ধের পর পুনর্গঠন নিয়ে ব্যস্ত। ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির সীমান্ত পরিস্থিতিও স্পর্শকাতর। ফলে ইসরায়েল যে সামরিক জোটকে নেতিবাচকভাবে দেখবে, তাতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দামেস্ক দ্বিধায় পড়তে পারে।
মিসরও বর্তমানে অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে ইয়েমেন ইস্যু ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে।
এই সমীকরণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গড়ে ওঠা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’। ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই উদ্যোগকে ভবিষ্যতে মক্কা জোটের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক কাঠামো হিসেবে দেখা হতে পারে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একদিকে ইসরায়েলকেন্দ্রিক সম্পর্ক ও জোট, অন্যদিকে পাকিস্তান–সৌদি–তুরস্কের নতুন নিরাপত্তা কাঠামো—এমন দুটি ভিন্ন শক্তিবলয় তৈরির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে বাস্তবতা জটিল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক কখনও সরল দুই মেরুর সমীকরণে আবদ্ধ ছিল না। একই দেশ একই সময়ে অন্য একটি দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা করতে পারে, আবার নির্দিষ্ট কোনো ইস্যুতে তার বিরোধিতাও করতে পারে।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে এটিকে এখনই নতুন আঞ্চলিক শক্তি বা ‘তৃতীয় অক্ষ’-এর জন্ম হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করার সময় আসেনি।
কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে জোট ও সমীকরণ গত কয়েক দশক ধরেই বারবার বদলেছে। আজকের মিত্র আগামীকাল অন্য কোনো ইস্যুতে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। আবার পুরোনো শত্রুতাও নতুন বাস্তবতায় সহযোগিতায় পরিণত হতে পারে।
এই জোটের প্রকৃত কার্যকারিতা বোঝা যাবে তখনই, যখন তিন দেশের কোনো একটি বাস্তব সামরিক হুমকির মুখে পড়বে এবং অন্য দুই দেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা সত্যিই নিজেদের মিত্রের হয়ে যুদ্ধে নামবে কি না।
সুতরাং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক কি একে অপরের জন্য একই ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়। আর সেই মুহূর্তে তিন দেশের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল একটি কূটনৈতিক ঘোষণা ছিল, নাকি সত্যিই ইসরায়েল ও ইরানের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি আঞ্চলিক শক্তির উত্থানের সূচনা।
সূত্র: আল-জাজিরা
মন্তব্য করুন