থ্রিলারের ভিড়ে বাবা-মেয়ের সম্পর্কের গল্প; সংযত অভিনয়ে মুগ্ধ বিদ্যা সিনহা মিম
ওটিটি প্ল্যাটফর্মে যেখানে থ্রিলার, ক্রাইম ও অ্যাকশনধর্মী কনটেন্টের আধিক্য, সেখানে এক ভিন্ন স্বাদের গল্প নিয়ে এসেছে চরকির নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘লাইফলাইন’। নির্মাতা কাজী আসাদ এবার তুলে ধরেছেন সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা এবং একজন বাবাকে ঘিরে মেয়ের নিরন্তর সংগ্রামের গল্প। প্রিয় মানুষকে বাঁচাতে একজন মানুষ কত দূর যেতে পারে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এগিয়ে যায় সিনেমার কাহিনি।
সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র অনন্যা, যার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বিদ্যা সিনহা মিম। গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, নৌকা থেকে নেমে এক দুর্গম চরের পথে যাত্রা শুরু করেন তিনি। তাঁর গন্তব্য ‘জোঁকের চর’, যেখানে খুঁজে বের করতে হবে আক্কাস আলীকে।
এই অভিযানে সঙ্গী হয় বাইকচালক কোরবান (রেজওয়ান পারভেজ)। প্রথমে অনিচ্ছুক থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাজি হয় সে। এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ ও অনিশ্চিত অনুসন্ধান। কেন অনন্যা আক্কাস আলীকে খুঁজছেন, আর কী এমন জরুরি কারণ—এসব প্রশ্নের উত্তর ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় গল্পের দ্বিতীয়ার্ধে।
‘লাইফলাইন’ শুরু হয় ধীর ছন্দে। প্রথমার্ধে গল্পের গতি কিছুটা মন্থর হলেও পরিচালক কাজী আসাদ ইচ্ছাকৃতভাবেই অতিরিক্ত নাটকীয়তা এড়িয়ে চরিত্রগুলোর আবেগকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
এই ধীরগতির মধ্যেও গ্রামবাংলার প্রকৃতি, নদী, চর, কাঁচা রাস্তা ও সূর্যমুখী ফুলের বাগানের মনোরম দৃশ্য দর্শকদের মুগ্ধ করে। চিত্রগ্রাহক ড্যানিয়েল হাওলাদার-এর ক্যামেরার কাজ সিনেমার অন্যতম শক্তি। দ্বিতীয়ার্ধে গল্পের জট খুলতে শুরু করলে সিনেমা নতুন গতি পায়।
অনন্যা চরিত্রে বিদ্যা সিনহা মিম তাঁর সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম পরিণত অভিনয় উপহার দিয়েছেন। গ্ল্যামারাস চরিত্রের গণ্ডি ভেঙে এক সাধারণ মধ্যবিত্ত তরুণীর ভূমিকায় তিনি নিজেকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেছেন।
মিমের এই অভিনয় প্রমাণ করে, বাণিজ্যিক সিনেমার বাইরে চরিত্রনির্ভর গল্পেও তিনি সমান দক্ষ।
মিমের বাবার চরিত্রে খায়রুল আলম সবুজ সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিতেই আবেগ ছড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও চরিত্রটিকে আরও কিছুটা সময় দিলে গল্প আরও সমৃদ্ধ হতে পারত।
বাইকচালক কোরবান চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ সাবলীল অভিনয় করেছেন। অন্যদিকে, আ খ ম হাসান আবারও প্রমাণ করেছেন তিনি শুধু কৌতুক অভিনেতা নন। অসহায় এক বাবার চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে দাগ কাটে।
এ ছাড়া গাজী রাকায়েত, ফাতেমাতুজ জোহরা ইভা এবং শিশুশিল্পী আনিসা নুর আয়াত নিজ নিজ চরিত্রে প্রশংসার দাবিদার।
সিনেমাটির আবহসংগীতও গল্পের সঙ্গে মানানসই। অতিরিক্ত আবেগ তৈরি করতে অপ্রয়োজনীয় সাউন্ড ব্যবহার করা হয়নি। প্রয়োজনীয় জায়গায় নীরবতার ব্যবহার গল্পকে আরও শক্তিশালী করেছে। জাহিদ নিরব-এর সংগীত পরিচালনা প্রশংসার যোগ্য।
এ ছাড়া দেবাশীষ দাস-এর কণ্ঠে ‘খুঁজতে খুঁজতে’ এবং ঐশী-র কণ্ঠে ‘আমারে নাও’—দুটি গানই গল্পের আবহকে সমৃদ্ধ করেছে।
যারা দ্রুতগতির থ্রিলার বা টুইস্টে ভরা গল্প খুঁজছেন, তাঁদের কাছে ‘লাইফলাইন’ কিছুটা ধীরগতির মনে হতে পারে। তবে যারা সম্পর্ক, অনুভূতি এবং মানবিক গল্পের সিনেমা পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এটি হতে পারে একটি হৃদয়ছোঁয়া অভিজ্ঞতা। গ্ল্যামারের মোড়ক ছেড়ে বিদ্যা সিনহা মিমের সংযত ও পরিণত অভিনয়ই সিনেমাটির সবচেয়ে বড় অর্জন।
মন্তব্য করুন