নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:৫৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ২৬ জন

জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি দানের বিধান পুনর্বিবেচনার দাবি মামুনুল হকের

জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও দাতার জীবনকাল পর্যন্ত ওই সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহার তাঁর কাছে রাখার বিধান নিয়ে শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেছেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ প্রয়োজনীয় হলেও এর মাধ্যমে ইসলামের হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মৌলিক বিধান যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে তিনি Transfer of Property (Amendment) Act, 2026 সংসদে দ্রুত পাসের সমালোচনা করে আইনটির সংশ্লিষ্ট বিধান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, গতকাল রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সংসদে পাস হওয়া আইনের ১২২এ ও ১২২বি ধারার বিষয়ে আলেম-উলামা ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা উচিত।

মামুনুল হক বলেন, ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান বা হেবা এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার বণ্টন বা ফারায়েজ সম্পূর্ণ পৃথক দুটি বিষয়। তাই জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তরের কোনো আইন যেন পরবর্তী সময়ে শরিয়াহ নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার সংকুচিত বা বাতিল করার সুযোগ তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, ইসলামে হেবা কেবল দলিলে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী ইজাব, কবুল ও কবয হেবার গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক শর্ত। বিশেষ করে গ্রহীতার বাস্তব দখল ও কর্তৃত্ব হেবা সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর ভাষ্য, নতুন আইনে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের কথা বলা হলেও দাতার জীবদ্দশা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহার তাঁর কাছেই রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে এমন ব্যবস্থায় প্রকৃত মালিকানা হস্তান্তর ও কবযের শরয়ী বিষয়টি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের নির্দেশ

মামুনুল হক তাঁর বিবৃতিতে হেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ইসলামে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি নু‘মান ইবনে বশীর (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসের উল্লেখ করে বলেন, এক সন্তানকে বিশেষভাবে দান করার ঘটনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর পিতাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, অন্য সন্তানদেরও অনুরূপ দেওয়া হয়েছে কি না। উত্তর না হলে তিনি আল্লাহকে ভয় করা এবং সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দেন। পরে ওই দান ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর তা প্রত্যাহারের বিষয়েও রাসুলুল্লাহ ﷺ কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে হেবা ফিরিয়ে নেওয়াকে অত্যন্ত কঠোর উপমার মাধ্যমে নিষেধ করা হয়েছে।

মামুনুল হকের মতে, এসব দৃষ্টান্ত থেকে স্পষ্ট যে ইসলামে হেবা একটি স্বতন্ত্র শরয়ী বিধান, যার সঙ্গে মালিকানা, কবয, দখল, ন্যায়বিচার এবং প্রত্যাহারের মতো বিষয় সরাসরি সম্পর্কিত।

ফারায়েজ পাশ কাটানোর সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ

বিবৃতিতে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নতুন আইনের সুযোগ ব্যবহার করে কেউ যদি জীবদ্দশায় নির্দিষ্ট কোনো উত্তরাধিকারীর নামে সম্পত্তি এমনভাবে হস্তান্তর করেন, যাতে তাঁর মৃত্যুর পর অন্য ওয়ারিশরা কার্যত বঞ্চিত হন, তাহলে তা ইসলামের উত্তরাধিকার ব্যবস্থার ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার যদি বলে থাকে যে নতুন বিধান সাধারণ হেবা বা মুসলিম আইনের হেবাকে প্রভাবিত করবে না, তাহলে বাস্তবে আইনটি শরিয়াহ নির্ধারিত হেবার কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে সম্পত্তির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের কোনো নতুন ব্যবস্থা তৈরি করছে কি না, সেটি পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি

মামুনুল হক বলেন, হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মতো গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত আইন প্রণয়নের আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, মুফতি, ফকীহ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল।

তিনি অভিযোগ করেন, সংসদে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি ওঠার পরও বিলটি দ্রুত পাস করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

আইনটির পক্ষে আইনমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এতে ইসলামী বিধান সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতা কিংবা অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর দাবি, হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মৌলিক পার্থক্য যথাযথভাবে না বুঝে মুসলিম পারিবারিক আইনসংক্রান্ত বিধান প্রণয়ন গ্রহণযোগ্য নয়।

১২২এ ও ১২২বি ধারা পুনর্বিবেচনার দাবি

মামুনুল হক বলেন, বিএনপি তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গীকারে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সমুন্নত রাখা এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। একই সঙ্গে ইসলামবিরোধী কোনো আইন না করার অঙ্গীকারের কথাও বলা হয়েছে।

তাঁর প্রশ্ন, তাহলে ইসলামের হেবা ও ফারায়েজের মতো গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহ বিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আইন এত দ্রুত পাস করা হলো কেন?

তিনি Transfer of Property (Amendment) Act, 2026-এর ১২২এ ও ১২২বি ধারা পুনর্বিবেচনা করে আলেম-উলামা, মুফতি, ফকীহ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানান।

মামুনুল হক বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। তবে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে শরিয়াহর হেবা বিধান কিংবা আল্লাহ নির্ধারিত ফারায়েজের কাঠামো দুর্বল করা যাবে না। মানুষের তৈরি আইন যেন কোনোভাবেই আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

বিবৃতির শেষাংশে তিনি বলেন, এ ধরনের যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ধর্মপ্রাণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হতে হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে তিন বাসে আগুন, যাত্রাবাড়ীতে পরপর ৪ ককটেল বিস্ফোরণ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘ছয় মাসের সাফল্য’ নিয়ে হাসনাতের ফেসবুক পোস্ট

অপ্রতিম হত্যার বিচার দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ

ট্রাম্পের বৈঠকের তালিকায় নেই নেতানিয়াহু, অনিশ্চিত সাক্ষাৎ

আসিয়ান কাপে বড় কিছুর প্রত্যাশা জামালের, লক্ষ্য পরের রাউন্ড

আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা? রহস্য উদঘাটনের দাবি পুলিশের, দুপুরে সংবাদ সম্মেলন

ঢাকাজুড়ে কড়া নজরদারি, চেকপোস্টে সন্দেহজনক যানবাহনে তল্লাশি

সব মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণে অভিন্ন সিলেবাসের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

কর্মসূচিতে ঠাসা তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর

নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিষয়ে নেই নির্দেশনা

১০

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও ৫ বছর বাড়ালেন ট্রাম্প

১১

‘বাইরের কেউ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ঠিক করে দিতে পারে না’: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

১২

তিতাসের ২৮ নম্বর কূপে মিলবে দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস

১৩

গণভোটের রায় না মানলে এক দফার আন্দোলন’: মামুনুল হক

১৪

‘জাতির প্রয়োজনে আট দফা যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে’: শফিকুর রহমান

১৫

টিসিবি কার্ড থেকে বাদ ৫৯ লাখ অযোগ্য সুবিধাভোগী

১৬

‘মানুষ যে ধরনের আইন চায়, সরকার সে ধরনের আইনই করবে’: আইনমন্ত্রী

১৭

‘শারীরিক ও মানসিক—সব দিক থেকেই প্রতারণার শিকার হয়েছি’: ঈশা রিখী

১৮

‘ছট মাইয়া’র গানের দৃশ্য দেখে পুরোহিত খুশি, জানালেন তামান্না

১৯

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক হলেন আবুল খায়ের

২০