রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছর পূর্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তায় অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সংকটের স্থায়ী সমাধান ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কার্যকর উদ্যোগ ও নতুন রাজনৈতিক অঙ্গীকারের আহ্বান জানিয়েছে। ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট—রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের একমাত্র পথ।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের যুক্ত করে বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। ২০২৪ সালের শুরু থেকে আনুমানিক আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।
দীর্ঘ নয় বছর ধরে আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও টেকসইভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। ঢাকা ও নেপিডোর মধ্যে প্রত্যাবাসন নিয়ে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও এখনো নির্দিষ্ট সময়সূচি বা কার্যকর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি।
সর্বশেষ আলোচনায় মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশ পাঠানো তালিকার ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে তারা রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই সংখ্যা পর্যাপ্ত নয় বলে আপত্তি জানানো হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে পাঠিয়েছিল।
বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের মতে, শুধু পরিচয় যাচাই করলেই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, বসবাসের নিশ্চয়তা, চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে নাগরিকত্বের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে প্রত্যাবাসন করা হলে রোহিঙ্গারা আবারও নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকায় সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফেরার পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের পুনর্গঠিত জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের জন্য ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন ধরা হয়েছে। এই আবেদন ২০২৫ সালের প্রয়োজনের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম।
অর্থায়ন সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে খাদ্য, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা আরও কমে গেলে ক্যাম্পে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও মা-শিশু স্বাস্থ্য কার্যক্রমেও চাপ বাড়তে পারে।
দীর্ঘদিন ক্যাম্পে আটকে থাকার কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। কাজের সুযোগ সীমিত, শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হওয়ায় তরুণদের একটি অংশ ঝুঁকিপূর্ণ পথে ক্যাম্প ছাড়ার চেষ্টা করছে।
পাচারকারীদের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার প্রবণতা মানবিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, মাদক পাচার, সংঘাত ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও বাড়ছে চাপ। খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবহন, কর্মসংস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে। উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলো বর্ষাকালে পাহাড়ধস, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব দুর্যোগের তীব্রতা বাড়লে রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিও আরও বাড়তে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য। তিনি বলেন, ১০ বছর যেন কোনোভাবেই ২০ বছরে পরিণত না হয়।
মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠী, ক্যাম্পের স্থিতিশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, মানবিক সহায়তায় ক্লান্তি যেন মানবিক পরিত্যাগে পরিণত না হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম বলেন, সংকটের প্রতিটি অতিরিক্ত বছর রোহিঙ্গাদের শিক্ষাজীবনের ব্যাঘাত, শৈশব হারানো, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, মানসিক দুর্বলতা ও অনিয়মিতভাবে অন্যত্র চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। টেকসই সমাধানে জাতিসংঘ, আঞ্চলিক অংশীদার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করতে বাংলাদেশ প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশন মাইকেল মিলার বলেন, রোহিঙ্গা সংকট একটি মানবসৃষ্ট ট্র্যাজেডি এবং এর সমাধান রাজনৈতিক। প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
চীনা দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ ইয়ুইনও রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, সংকটের পেছনে জটিল নীতিগত বিষয় রয়েছে এবং চূড়ান্ত সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, নবম বছরে পা দেওয়া রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সহায়তার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রত্যাবাসন, নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, মানবাধিকার, পরিবেশ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল সমীকরণ। সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত হতে না দিতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক অর্থায়ন এবং মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ।
মন্তব্য করুন