মঙ্গলবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীরাও পরাজিত হয়েছেন। এতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অভিজ্ঞ রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ জন ফিহেরি নির্বাচনের ফলকে ট্রাম্পের জন্য ‘বড় বিপর্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্পের প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সময় যত গড়াবে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব তত দুর্বল হতে পারে।
তবে নির্বাচনের ফলকে নিজের বিরুদ্ধে আঘাত হিসেবে মানতে রাজি নন ট্রাম্প। মঙ্গলবার রাতে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই ফলকে তিনি নিজের ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছেন না।
নির্বাচনে জয়ের ফলে এখন ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দেওয়া, প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা এবং মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাবে। ফলে নিজের নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়নে নির্বাহী আদেশের ওপর ট্রাম্পের নির্ভরতা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্পের সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বুধবার ইরান যুদ্ধকে নির্বাচনে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে তিনি ট্রাম্পের অবস্থান থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করছেন। দলের ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রভাব কমছে বলে মনে হলে অন্য রিপাবলিকান নেতারাও তাঁর নীতি থেকে নিজেদের আলাদা করতে পারেন।
হোয়াইট হাউসের ভেতরেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে কর্মী পদত্যাগ, মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এবং ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য তদন্ত মোকাবিলার প্রস্তুতি চলছে। তাঁর ভাষায়, বর্তমানে হোয়াইট হাউসে কর্মীদের মনোবল তলানিতে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, নির্বাচনের প্রায় ছয় সপ্তাহ আগেই অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের আশঙ্কা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সতর্ক করা সত্ত্বেও ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেননি। কর্মকর্তার অভিযোগ, ট্রাম্প কারও পরামর্শ শুনতে চাননি।
মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্প স্বীকার করেন, আট মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্ষতির কারণ হয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তকে এখনো সঠিক বলে মনে করেন তিনি।
রিপাবলিকানদের উদ্বেগ শুধু ইরান যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ নয়। মিশিগান ও আইওয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী আলোচনা থেকে জানা গেছে, হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণ এবং ওয়াশিংটনের বিভিন্ন স্থাপনা সংস্কারে ট্রাম্পের অতিরিক্ত মনোযোগ নিয়েও রিপাবলিকান ও স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
এক রিপাবলিকান রাজনৈতিক উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প আগামী দুই বছরও যদি একই বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে পরবর্তী নির্বাচনেও দলকে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।
নির্বাচনী পরাজয়ের পরও হোয়াইট হাউসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাঁর একটি ছবি প্রকাশ করে সেখানে লেখা হয়, ‘জনসাধারণের অবগতির জন্য: ট্রাম্প এখনো আপনাদের প্রেসিডেন্ট।’
নির্বাচনে পরাজয়ের পরও ট্রাম্পের হাতে উল্লেখযোগ্য নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। অভিবাসন, শুল্ক, আবাসন ও সরকারি ব্যয় নিয়ে নির্বাহী পদক্ষেপের প্রস্তুতি কয়েক মাস ধরেই নিচ্ছে হোয়াইট হাউস। এর মাধ্যমে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের বিরোধিতা সত্ত্বেও নিজের কর্মসূচির কিছু অংশ বাস্তবায়ন করতে পারবেন তিনি।
তবে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে কংগ্রেসের তদন্ত এড়ানো সম্ভব হবে না। হোয়াইট হাউসের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষায়, প্রশাসনের কেউই এসব তদন্তের মুখোমুখি হতে চান না।
সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলের পর ট্রাম্প প্রশাসনে সম্ভাব্য রদবদল, নীতিগত পরিবর্তন এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
মন্তব্য করুন