ইরান, গাজা, লেবানন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা; দুই নেতার সম্পর্ক নিয়ে জল্পনার মধ্যেই ওয়াশিংটনে মুখোমুখি বৈঠক।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মুখোমুখি বৈঠকে বসছেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, এই বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয়।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন নেতানিয়াহু। বৈঠকে ইরানের পাশাপাশি গাজা, লেবানন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপের পর ইরানকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত শুরু হয়, সেটিই এবার আলোচনার মূল বিষয়। তবে ওয়াশিংটনের দাবি, তারা এখন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধানের পথ খুঁজছে।
চলতি মাসের শুরুতে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হলেও, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ইসরায়েল সরাসরি অংশ নেয়নি।
ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফেরার পর এটি হবে দুই নেতার অষ্টম বৈঠক এবং ইরান যুদ্ধের পর প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ।
যুক্তরাষ্ট্রে রওনা হওয়ার আগে নেতানিয়াহু বলেন,
“আলোচনার সূচিতে থাকা সব বিষয় নিয়েই আমরা কথা বলব। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইরান। একই সঙ্গে আমাদের লক্ষ্য হবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আমাদের চারপাশে শান্তির পরিধি আরও বিস্তৃত করা।”
তিনি আরও বলেন,
“প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এমন জটিল সময়ে দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞা—দুটো নিয়েই এগোতে হয়।”
এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার সময় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কে টানাপোড়েনের খবর সামনে আসে। সে সময় ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেন এবং এক সাক্ষাৎকারে তাকে “খুবই কঠিন একজন ব্যক্তি” বলেও মন্তব্য করেন।
তবে নেতানিয়াহু বিষয়টিকে “কৌশলগত মতপার্থক্য” বলে উল্লেখ করে জানান, যুদ্ধের মূল লক্ষ্য নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
মঙ্গলবারের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত মাসে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে হওয়া কাঠামোগত চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হবে। যদিও মাঠপর্যায়ে সেই চুক্তি বাস্তবায়ন এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে।
এছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার পরিস্থিতি এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হতে পারে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা ইসরায়েল-হামাস সংঘাতে গাজার মানবিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ইয়োনাতান ফ্রিম্যান মনে করেন, এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করা।
তার ভাষায়,
“বিশ্বকে, বিশেষ করে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকে দেখানোই মূল লক্ষ্য যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কে কোনো ভাঙন বা বড় ধরনের মতবিরোধ নেই।”
তিনি আরও বলেন, দুই নেতার মধ্যে মতপার্থক্য মূলত যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল নিয়ে। তবে যুদ্ধের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের অবস্থান প্রায় একই।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের অগ্রাধিকার থাকবে দুটি বড় ইস্যুতে—ইরান এবং আব্রাহাম চুক্তি আরও সম্প্রসারণ।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল প্রথমবারের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং পরে মরক্কোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে।
অন্যদিকে, কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, বৈঠকে লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমানোর বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
নেতানিয়াহুর এই সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন আর কয়েক মাস দূরে। তিনি আবারও ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যে নির্বাচনে অংশ নিতে চান।
তবে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তিনি জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে রয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা প্রতিরোধে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে জনঅসন্তোষ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। সেই হামলার পর থেকেই শুরু হয় গাজা যুদ্ধ, যার প্রভাব এখনো পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিদ্যমান।
মন্তব্য করুন