মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ন্যাটোর প্রতি পুনরায় দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন ইউরোপীয় নেতারা। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে ইরান যুদ্ধ, ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই উত্তেজনা বিরাজ করছে।
মঙ্গলবার রাতে ন্যাটোর ৩২ সদস্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা নৈশভোজে অংশ নিলেও মূল শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে বুধবার। এর আগে সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে ন্যাটোর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষার প্রতি অটল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে নেতাদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পরই ঘোষণাপত্রটি প্রকাশ করা হবে।
আঙ্কারায় পৌঁছে ট্রাম্প বলেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক না থাকলে তিনি হয়তো এই সম্মেলনেই অংশ নিতেন না। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপ থেকে আরও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
সম্মেলনের আগে ন্যাটো জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে অন্তত ৫ হাজার কোটি ডলারের নতুন অস্ত্র ক্রয় ও প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য ইউরোপের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানো।
তবে ট্রাম্প আবারও ন্যাটোর সদস্যদের সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অভিযানে মিত্র দেশগুলো ওয়াশিংটনকে প্রত্যাশিত সমর্থন দেয়নি।
তিনি বলেন, “আমরা শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছি, কিন্তু প্রয়োজনে তারা আমাদের পাশে দাঁড়ায় না। অথচ আমরা সব সময় তাদের পাশে থেকেছি।”
ট্রাম্পের অভিযোগ, ইরান যুদ্ধের সময় কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ মার্কিন বাহিনীকে তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে পর্যাপ্ত সহযোগিতা দেয়নি। যদিও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বিদ্যমান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা সহযোগিতা করেছেন। একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের আগে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির প্রতিও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। ইরান ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করলেও ইতালির কর্মকর্তারা সেই বিরোধ নিরসনে কাজ করছেন।
এদিকে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, ন্যাটোভুক্ত দেশ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা উচিত। এর জবাবে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেদেরিকসেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে হবে এবং গ্রিনল্যান্ড কোনোভাবেই বিক্রির জন্য নয়।
দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এবং নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে ট্রাম্প প্রশাসন। এরই মধ্যে ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানো এবং ন্যাটোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় নেতারা বলছেন, তারা মহাদেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি নিতে প্রস্তুত। তবে এই পরিবর্তন ধাপে ধাপে এবং সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে চান তারা, যাতে কোনো নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি না হয় এবং রাশিয়া সেই সুযোগ নিতে না পারে।
কূটনৈতিক মহলের আশা, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক সম্মেলনের উত্তেজনা প্রশমনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য করুন