অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে গিয়ে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনে অসাধারণ জয়ের পর ম্যাকেতে বড় ব্যবধানে হারলেও পুরো সফরে বাংলাদেশের বোলারদের পারফরম্যান্স ও দলের মানসিক দৃঢ়তা প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিক সাফল্য পেতে হলে এবার ব্যাটারদেরও দায়িত্ব নিতে হবে বলে মনে করছেন সাবেক ক্রিকেটার ও কোচরা।
ডারউইনে পাওয়া জয়ে টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছয়ে উঠে এসেছে, যা টেস্ট ক্রিকেটে দেশের সর্বোচ্চ অবস্থান। চলমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারানোর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ ১-১ ড্র করেছে দলটি। ফলে পয়েন্ট তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ।
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বছরের শেষটা দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয় দিয়ে শেষ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন। সাবেক ওপেনার ও ধারাভাষ্যকার আতহার আলী খানও মনে করেন, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বাংলাদেশ জিততে পারে। তবে এজন্য ব্যাটারদের বড় ভূমিকা রাখতে হবে।
আতহার বলেন, বাংলাদেশ যদি ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জিততে পারে, তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও জয় পাওয়া সম্ভব। তবে সেখানে প্রতিটি ইনিংসে ৩৫০ থেকে ৪০০ রান করতে পারলে নিজেদের মাটিতেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে চাপে ফেলার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের সাবেক পেস বোলিং কোচ শন টেইটের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় জয়ের লক্ষ্য শান্তর আক্রমণাত্মক মানসিকতারই প্রতিফলন। তার বিশ্বাস, বাংলাদেশ দলের বোলিং আক্রমণ যেকোনো পরিবেশেই সফল হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে বাংলাদেশকে নিয়ে খুব বেশি আশাবাদ ছিল না। ডারউইনে প্রথম টেস্টের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়েছিল দল। কিন্তু মূল ম্যাচে ব্যাট-বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ।
টেইট বলেন, বোলিং নিয়ে তিনি খুব একটা অবাক হননি। বরং অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে বাংলাদেশের ব্যাটিং নিয়ে কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। তবে প্রথম টেস্টে ব্যাটাররাও প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছেন বলে মনে করেন তিনি।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান ও এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পেসাররা নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছেন।
হাসান মাহমুদ ও শরিফুল ইসলামের সামর্থ্যের প্রশংসা করেছেন শন টেইট। তার মতে, হাসান দীর্ঘ সময় সফল হতে পারেন। তাকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে কাউন্টি ক্রিকেটে খেলার সুযোগ দিলে বাংলাদেশের ক্রিকেট আরও উপকৃত হবে।
শরিফুলের মানসিক দৃঢ়তার ওপরও জোর দিয়েছেন টেইট। তার মতে, শারীরিকভাবে ফিট ও শক্তিশালী শরিফুলের বোলিং অ্যাকশনও দারুণ। খারাপ পারফরম্যান্স দ্রুত ভুলে পরের স্পেলে মনোযোগ দেওয়ার বিষয়টিতে তার সঙ্গে কাজ করেছেন টেইট।
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা। ডারউইনে প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করা দলটিই কয়েক দিন পর ম্যাকেতে দুই ইনিংসে যথাক্রমে ৬৪ ও ৯৫ রানে অলআউট হয়েছে।
আতহার আলী খান মনে করেন, বোলাররা যেভাবে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে দলকে ম্যাচ জেতাচ্ছেন, ব্যাটারদেরও একই ধরনের ধারাবাহিকতা দেখাতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাটারদের সামর্থ্য নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই। রাওয়ালপিন্ডিতে ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর লিটন দাসের দুর্দান্ত শতক এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি সেই সামর্থ্যের প্রমাণ।
বিদেশের মাটিতে টেস্ট জিততে হলে ব্যাটারদের শট নির্বাচনে আরও সচেতন ও ধৈর্যশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আতহার।
তার মতে, নতুন বলের কঠিন সময়টা পার করে উইকেটে সেট হওয়ার পর আক্রমণাত্মক শট খেলা উচিত। অফ স্টাম্পের বাইরের বল তাড়া করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় শট খেলে উইকেট হারানো থেকে ব্যাটারদের বিরত থাকতে হবে।
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতা ফিরলে টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে ছয়ে থাকা শুধু ধরে রাখাই নয়, আরও ওপরে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। বোলাররা ইতোমধ্যে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন; এখন ব্যাটাররা কতটা এগিয়ে আসতে পারেন, সেটিই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
মন্তব্য করুন