মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান (রহ.)
২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৫০ জন

বরকতময় রমজান ও শয়তানের বন্দিত্ব

আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যখন রমজান মাস শুরু হয়, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় আর শয়তানদের শেকলে বেঁধে রাখা হয়। (সহিহ বুখারি: ৩২৭৭)

আরেকটি হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) বলেন, যখন রমজান মাসের প্রথম রাত শুরু হয়, শয়তান ও অবাধ্য জিনদের বন্দী করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর একটিও খোলা রাখা হয় না। অন্যদিকে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। একটিও বন্ধ রাখা হয় না। তখন একজন আহ্বানকারী (ফেরেশতা) ঘোষণা দেন, হে কল্যাণ অনুসন্ধানকারী, আল্লাহর কাজে এগিয়ে যাও। হে অকল্যাণ ও মন্দ অনুসন্ধানী, তোমরা থেমে যাও। এ মাসে আল্লাহ তাআলা মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন এবং এটা (রমজান মাসের) প্রত্যেক রাতেই হয়ে থাকে। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৪২, সুনানে তিরমিজি: ৬৮২)

এখানে শয়তানকে বন্দী করে ফেলাটা সামগ্রিক অর্থে বলা হয়নি, বরং ব্যক্তিগত অর্থে বলা হয়েছে। অর্থাৎ এর মানে এই নয় যে পৃথিবীর সব শয়তান এক মাসের জন্য পুরোপুরি বন্দী হয়ে যায়। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—যে ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে রোজা রাখে, রোজার সব আদব ও শর্ত মানে, রোজার হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করে, তার ক্ষেত্রে শয়তানের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। রমজানে এমন রোজাদারের ওপর শয়তান প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। (অন্য সময় সব অবস্থাতেই শয়তান মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে, এমনকি নামাজ পড়ার সময়ও।)

এই হাদিসে রমজান মাস ও রোজা রাখার যে উপকারিতার কথা বলা হয়েছে, তার সম্পর্ক মূলত ব্যক্তির সাথে, রোজাদারের সাথে; রোজার সাথে নয়। অর্থাৎ যে শুধুমাত্র সকাল-সন্ধ্যা না খেয়ে থাকে, আত্মসংযম করে না, নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকে না, তার জন্য শয়তান বন্দী নয়। কিন্তু যে রোজাদার রোজাকে নিজের জন্য ঢাল বানিয়ে নেয়, এর মাধ্যমে আত্মিক সংশোধন চায়, উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করে, তার জন্য শয়তান বন্দী থাকে।

যখন রমজান মাস আসে এবং কোনো মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখে, তখন তার ভেতরে আল্লাহর ভয় জন্ম নেয়, সে তাকওয়ার পথে চলতে শুরু করে। এই আমলের মধ্য দিয়ে তার মাঝে এক ধরনের রুহানি অনুভূতি জাগে, যা তাকে সেই সব কল্যাণের উপযুক্ত করে তোলে—হাদিসে যার উল্লেখ রয়েছে।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়াবান হতে পার। (সুরা বাকারা: ১৮৩)

তাকওয়া মূলত দ্বীনি সচেতনতার অন্য নাম। এই দৃষ্টিতে রোজার উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরে ধর্মীয় অনুভূতিকে জাগ্রত করা; তাকে উদাসীনতা থেকে বের করে সংবেদনশীল মানুষে পরিণত করা। প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতির ভেতরে এক ধরনের আল্লাহমুখী সত্তা লুকিয়ে থাকে। রোজা সেই সুপ্ত সত্তাকে জাগিয়ে তোলার জন্যই।

প্রতি বছর রমজান মাস আসে মানুষকে রোজার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আল্লাহর সাথে আবার সংযুক্ত করার জন্য, তার অনুভূতিকে পুনর্জীবিত করার জন্য। একজন মুমিন যখন রোজা অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে বলে, ‘হে আল্লাহ, আমাকে বিভ্রান্তকারী শয়তান থেকে হেফাজত করুন। আমার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দিন, কোনো দরজা যেন বন্ধ না থাকে। আর জাহান্নামের দরজা আমার ওপর বন্ধ করে দিন, কোনো দরজা যেন খোলা না থাকে।’—তখন যার রোজা সত্যিকার অর্থে এই দোয়ার রূপ নেয়, তার ক্ষেত্রেই হাদিসের বর্ণিত সুসংবাদ বাস্তব হয়।

রোজা যেন এক বার্ষিক সুযোগ যার মাধ্যমে মানুষ শয়তানের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে। হাদিসে ‘শয়তানকে বন্দী করা’ বলে এটাই বুঝানো হয়েছে—যে রোজাদার রোজার মাধ্যমে এমন প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করে যে শয়তান তাকে প্রভাবিত করতে পারে না, আল্লাহ তখন তার রোজা কবুল করেন।

একইভাবে বলা হয়েছে, রমজানে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয়। এর মর্মার্থ হলো, যে রোজা মানুষের ভেতরে এই আশা-আকাঙ্ক্ষা জাগায় যে সে আল্লাহর কাছে জান্নাত কামনা করবে এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাইবে, আল্লাহ তাকে সেটাই দেন যা সে চেয়েছিল।

প্রত্যেক আমল মানুষকে কোনো না কোনো প্রতিদানের যোগ্য করে তোলে। রোজা মানুষকে এই যোগ্যতা দেয় যে আল্লাহ তার ওপর বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষণ করবেন, তাকে ফেতনা থেকে হেফাজত করবেন এবং নিজের চিরস্থায়ী রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন।

তর্জমা: মওলবি আশরাফ

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এক কর্মকর্তার হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, আইসিটি বিভাগে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন

গাজীপুরের পূবাইলে সাংবাদিকের পৈত্রিক জমি দখলের অভিযোগ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

জবি বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের যাত্রা শুরু, আহ্বায়ক দিদার, সদস্য সচিব রাতুল

বাড়তি বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ তাসনিম জারার, ‘হুমকি নয়, গ্রাহকদের জবাব দিন’

ইরানের প্রেসিডেন্টের ‘পদত্যাগ’ গুঞ্জন উড়িয়ে দিল তেহরান, ‘মিথ্যা’ বলছে প্রেসিডেন্টের দপ্তর

জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৬ আগস্ট থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

জবিতে ছাত্রদল-জকসু-ছাত্রশক্তির সংঘর্ষ, ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন

‘আমার বাসার বিদ্যুৎ বিলও অস্বাভাবিক বেড়েছে’: আজহারীর অভিযোগ, ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান

সৌদি যুবরাজের কূটনৈতিক উদ্যোগে ইরানে নতুন হামলা স্থগিত ট্রাম্পের, আলোচনার সম্ভাবনা জোরালো

১০

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ ঘিরে দেশজুড়ে র‌্যাবের বিশেষ নিরাপত্তা: নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা ও সাইবার পেট্রোলিং জোরদার

১১

বন্যাদুর্গত চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর সফর ৯ আগস্ট: ত্রাণ বিতরণ ও ১০০ গৃহহারা পরিবারের হাতে নতুন বাড়ির চাবি

১২

শতাধিক প্রাণহানির মধ্যেও ‘মার্চ টু ঢাকা’র প্রস্তুতি: রাজধানীমুখী জনস্রোতে আন্দোলনের চূড়ান্ত অধ্যায়

১৩

গ্রিসে দাবানল নেভানোর অভিযানে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ, নিহত ২ ক্রু সদস্য

১৪

‘৫ আগস্ট ঘিরে নাশকতার সক্ষমতা নেই আ. লীগের’, বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

১৫

‘চীন সবসময় বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু থাকবে’, ঢাকায় রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের অঙ্গীকার

১৬

‘ছাগলকাণ্ডে’ আলোচিত মতিউরের বিরুদ্ধে চার্জগঠন, দুর্নীতি মামলায় বিচার শুরু

১৭

অভ্যুত্থানের পর প্রথমবার বিদেশি প্রতিনিধির সঙ্গে সু চির সাক্ষাৎ, স্বাস্থ্য নিয়েও বাড়ছে নজর

১৮

অবশেষে বিয়ের পিঁড়িতে রোনালদো-জর্জিনা, মাদেইরায় বসছে জমকালো আয়োজন

১৯

হরমুজ ইস্যুতে আজ থেকেই নতুন দফার আলোচনা, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা আপাতত স্থগিত: ট্রাম্প

২০