চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড দাবদাহ, তীব্র খরা, দাবানল ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের তাপমাত্রাজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব।
বুধবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক বছরের তুলনায় চলতি বছরের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত এই প্রাণহানি ঘটতে পারে।
গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে লড়াই করা এসব দেশের মানুষের চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও তুলনামূলক কম।
গবেষণার সহলেখক ও ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ফেব্রুয়ারির মধ্যে এল নিনোর প্রভাব কমে যাওয়ার কথা থাকলেও এর কারণে সৃষ্ট তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকি আরও কয়েক মাস থাকতে পারে। এমনকি আগামী বছরের গ্রীষ্ম পর্যন্ত এর প্রভাব অনুভূত হতে পারে বলেও জানান তিনি।
গবেষণায় বিশ্বের ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের স্থানীয় তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গত তিন দশকের গড় তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর সঙ্গে ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্ভাব্য মৃত্যুহারের তুলনা করে অতিরিক্ত প্রাণহানির হিসাব করা হয়েছে।
গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তের শুষ্ক সাহেল অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেখানে এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
এ ছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলকেও উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।
সম্ভাব্য প্রাণহানি কমাতে দাবদাহের আগাম সতর্কবার্তা, শীতলীকরণ কেন্দ্র, বিনামূল্যে খাবার পানির ব্যবস্থা এবং উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষার মতো পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।
পাশাপাশি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, বয়স্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের বাড়তি নজরদারি এবং জরুরি পরিস্থিতির আগে অর্থ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অভিযন্ত তিওয়ারি বলেন, গবেষণাটিকে আতঙ্ক ছড়ানোর বিষয় হিসেবে না দেখে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর মতে, কোনো দেশের পরিকল্পনা থাকা এবং সেই পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা—দুটি ভিন্ন বিষয়।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতিমধ্যে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে শক্তিশালী এল নিনো চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের হিসাবে, এল নিনোর সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিক বছরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি চরম দাবদাহের দিন তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, চলতি এল নিনোর সময় দেখা দেওয়া তাপমাত্রা ভবিষ্যৎ জলবায়ুর একটি সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রায় দুই দশক পর পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে এমন তাপমাত্রাই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: এপি, দ্য গার্ডিয়ান
মন্তব্য করুন