শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের জাফনার চেম্মানি এলাকায় একটি গণকবর থেকে ৫৭২ জনের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের মধ্যে শিশু ও নবজাতকের কঙ্কালও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এটি দেশটিতে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গণকবর।
গত ফেব্রুয়ারিতে চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশান সম্প্রসারণের কাজের সময় মানুষের দেহাবশেষের সন্ধান পাওয়ার পর সেখানে খনন শুরু হয়। আগস্টে গণকবরটির তৃতীয় ধাপের খননকাজ শেষ করেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
খননকাজে মানুষের দেহাবশেষের পাশাপাশি চুড়ি, স্কুলব্যাগ ও দুধের বোতলের মতো বিভিন্ন সামগ্রীও পাওয়া গেছে। উদ্ধার করা দেহাবশেষগুলো বর্তমানে আদালতের নির্দেশে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের হেফাজতে রয়েছে।
চেম্মানি এলাকায় গণকবর থাকার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দণ্ডিত এক সেনাসদস্য আদালতে দাবি করেছিলেন, ওই এলাকায় শত শত মানুষের মরদেহ পুঁতে রাখা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যের পর ১৯৯৯ সালে সেখানে প্রথম দফা খনন চালিয়ে ১০টির বেশি মানবকঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। তবে এরপর তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
নতুন করে গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে আশা ও ক্ষোভ—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক তামিল পরিবারের ধারণা, এসব দেহাবশেষ গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ বা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ব্যক্তিদের হতে পারে। তারা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ২৬ বছর ধরে শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ চলে। তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই) ও সরকারের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হন। যুদ্ধ চলাকালে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী ও এলটিটিই—উভয়ের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।
শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশনের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, চেম্মানির বর্তমান গণকবরটি সাধারণ কবরস্থানের মতো নয় এবং প্রচলিত হিন্দু দাফনপ্রথার সঙ্গেও এর মিল নেই। বেশিরভাগ দেহাবশেষ পোশাকহীন অবস্থায় ঘনভাবে রাখা ছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে একটির ওপর আরেকটি মরদেহ পাওয়া গেছে। কবরগুলোও মাত্র এক থেকে দুই মিটার গভীরে ছিল।
প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপক রাজ সোমাদেবা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। দেহাবশেষের বয়স নির্ধারণে কিছু নমুনা বিদেশে পাঠানো হতে পারে। মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ জানতে পৃথক চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক পরীক্ষারও প্রয়োজন হবে।
শ্রীলঙ্কায় গত কয়েক দশকে ২০টির বেশি গণকবরের সন্ধান মিলেছে। তবে এসব গণকবরের কোনোটি এখন পর্যন্ত জোরপূর্বক নিখোঁজ বা বিচারবহির্ভূত হত্যার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা যায়নি এবং কোনো ঘটনায় বিচারের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ হয়নি।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে সরকার তদন্তে সহযোগিতা করছে বলে জানিয়েছে। বিচারমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কার বলেছেন, চেম্মানিতে খননকাজ অব্যাহত থাকবে। কঙ্কাল পরীক্ষা করে মৃত্যুর কারণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হবে। নিখোঁজদের পরিবারগুলোকেও ডিএনএ নমুনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, অতীতের নিখোঁজ ও যুদ্ধকালীন অপরাধের তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার কারণে পরিবারগুলোর মধ্যে আস্থা কমেছে। জাতিসংঘও ভুক্তভোগীদের পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
চেম্মানির গণকবর তাই দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারগুলোর কাছে অতীতের একটি ঘটনা নয়; বরং প্রিয়জনদের ভাগ্য জানার সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। বহু বছর পর সত্য ও বিচারের আশায় অপেক্ষা করছেন তারা।
মন্তব্য করুন