নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বিতর্ককে কেন্দ্র করে টানা এক মাসের আন্দোলনের পর ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং আন্দোলনকারীদের বেশ কয়েকটি দাবি সরকার মেনে নেওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। এখন প্রশ্ন উঠছে—আন্দোলনে সাফল্যের পর কি সরাসরি ভোটের রাজনীতিতে নামবে তরুণদের নেতৃত্বাধীন এই সংগঠন?
ভারতের রাজনীতিতে সিজেপিকে সরাসরি দেখা যাবে, নাকি সংগঠনটি রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ তৈরির আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন সংগঠনটির দুই শীর্ষ নেতা।
তবে এখনই পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা নাকচ করেছে সিজেপি। যদিও ভবিষ্যতে সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি সংগঠনটির অন্যতম মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ভারতে কোনো বিষয়কেই কখনোই চূড়ান্তভাবে না বলা যায় না।’
তবে সিজেপির আরেক মুখপাত্র সৌরভ দাস স্পষ্ট করেছেন, এই মুহূর্তে সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ তাদের প্রধান লক্ষ্য নয়।
তিনি বলেন, সংগঠনটির বর্তমান লক্ষ্য হলো আন্দোলনকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া। তার মতে, ভারতে ইতিমধ্যে শত শত রাজনৈতিক দল থাকলেও তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে তারা ব্যর্থ।
সৌরভ দাস বলেন, তারা এমন একটি শক্তিশালী জনভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চান, যাতে ক্ষমতায় থাকা যেকোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা তরুণদের দাবি পূরণে বাধ্য হন।
টানা আন্দোলনের পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, গত দুই মাস ধরে তিনি বাড়ির বাইরে ছিলেন। এখন কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চান।
তিনি বলেন, আন্দোলনের সাফল্য তাদের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি এটি আনন্দ ও স্বস্তিরও মুহূর্ত। এরপর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে তারা চিন্তা করবেন।
তবে সরাসরি রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি।
নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বিতর্ককে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনের পর পদত্যাগ করেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
পদত্যাগপত্রে তিনি জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। দেশের ঐক্য বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যাতে আইনি জটিলতায় আটকে না যায়, সে বিষয়টিকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ শাসনামলে বড় ধরনের গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের মধ্যে ধর্মেন্দ্র প্রধান দ্বিতীয়। এর আগে ২০১৮ সালে ‘মি টু’ আন্দোলনের সময় যৌন হয়রানির অভিযোগের পর পদত্যাগ করেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর।
আম আদমি পার্টির সাবেক কর্মী অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে মে মাসে একটি বিদ্রূপাত্মক অনলাইন ক্যাম্পেইন হিসেবে সিজেপির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে এটি ভারতের অন্যতম বড় যুব আন্দোলনে রূপ নেয়।
গত ২০ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলন নতুন গতি পায়। পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক যুক্ত হওয়ার পর আন্দোলন আরও জোরালো হয়। তিনি টানা ২৬ দিন অনশনের পর গত বৃহস্পতিবার অনশন ভাঙেন।
এরপর আন্দোলনকারীদের দাবিতে আলোচনার স্থান মন্ত্রীর বাসভবন থেকে সরিয়ে নিরপেক্ষ স্থান হিসেবে কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে সিজেপি নেতাদের চূড়ান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
চূড়ান্ত বৈঠক সম্পর্কে আশুতোষ রাঙ্কা জানান, আগের আলোচনার তুলনায় শেষ বৈঠকের পরিবেশ ছিল অনেক বেশি সৌহার্দ্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন।
আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলা ও এফআইআর প্রত্যাহারের বিষয়েও সরকার নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বলে জানান তিনি। ভবিষ্যতে সিজেপির কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা না করার বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে বলে দাবি করেন রাঙ্কা।
তিনি বলেন, সিজেপি শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে ছিল এবং গত ৩৭ দিনে তারা সেই অবস্থানই বজায় রেখেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘ভাইরাস’ হিসেবে অভিহিত না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আশুতোষ রাঙ্কা।
তিনি বলেন, আন্দোলনকারীরা পেশাদার রাজনীতিক বা আন্দোলনকারী নন; তারা সবাই নিজ নিজ পেশায় যুক্ত ছিলেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন।
তার ভাষায়, শেষ পর্যন্ত তারা ন্যায়বিচার পেয়েছেন।
সব মিলিয়ে, নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া সিজেপির আন্দোলন এখন ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক প্রশ্ন তৈরি করেছে—আন্দোলনের সাফল্যের পর কি এবার সরাসরি ভোটের রাজনীতিতে নামবে ককরোচ জনতা পার্টি, নাকি তরুণদের চাপ সৃষ্টিকারী একটি শক্তিশালী আন্দোলন হিসেবেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে?
মন্তব্য করুন