চার দশকের মার্কিন নীতির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এক বাস্তবতা— ইরানের ক্ষমতার কাঠামো, আদর্শিক অবস্থান ও নেতৃত্বকে সঠিকভাবে মূল্যায়নে বারবার হোঁচট খেয়েছে ওয়াশিংটন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, ইরান আলোচনায় ‘অবিশ্বাস্য রকম প্রতারণাপূর্ণ’ আচরণ করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই হতাশা শুধু ট্রাম্পের নয়; ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রায় প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইরানের জটিল রাজনৈতিক কাঠামো ও নেতৃত্বকে বোঝার ক্ষেত্রে একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বা সমঝোতার চেষ্টা বহুবার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
সাম্প্রতিক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বারবার প্রতারণামূলক আচরণ করছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন সমঝোতার সম্ভাবনা থাকলেও সেখানে ইরানের টোল আদায়ের দাবি ওয়াশিংটনের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে একটি অনুকূল সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছেন।
সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক কর্মকর্তা কেনেথ পোলকের মতে, ইরানের নেতৃত্বকে সবচেয়ে কম বুঝতে পেরেছেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, শক্তি প্রদর্শন কিংবা কূটনীতি— কোনো কৌশলই ট্রাম্পকে কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিতে পারেনি।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনি বলেন, মার্কিন নীতিনির্ধারকরা দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের আদর্শিক অবস্থান এবং ক্ষমতার কাঠামোর গভীরতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তার মতে, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের অভাবও এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার থেকে শুরু করে রোনাল্ড রিগ্যান, বিল ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প— সবাই কোনো না কোনো সময় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছেন। তবে অধিকাংশ উদ্যোগই ব্যর্থ হয়েছে অথবা বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
এর ব্যতিক্রম ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার পর ২০১৫ সালে তার প্রশাসন ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। যদিও ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কূটনীতিক ডেনিস রসের মতে, ইরান বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও কৌশল ভালোভাবে বুঝে নিজেদের দরকষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
তার ভাষায়, “আমাদের সবসময় তাড়াহুড়ো থাকে, আর ইরান জানে সময় তাদের পক্ষেই কাজ করে। সেই সুবিধাটিই তারা বারবার কাজে লাগায়।”
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামি বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামো এখনো বহুলাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্ট বদলালেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেহরানের সঙ্গে টেকসই সমঝোতা অর্জন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ।
মন্তব্য করুন