উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের প্রতি সমর্থন বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি থেকে চীন নড়বে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গতকাল সোমবার পিয়ংইয়ংয়ে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে কিম জং উনকে তিনি এই কথা বলেন। দীর্ঘ সাত বছর পর উত্তর কোরিয়া সফরে গিয়ে শি জিনপিং দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করার এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক স্বার্থ যৌথভাবে রক্ষা করার ওপর জোর দেন।
রাশিয়ার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও সামরিক সম্পর্কের জেরে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি যখন চাঙ্গা, ঠিক তখনই দুই দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে গেলেন শি জিনপিং। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেদিকেই মোড় নিক না কেন, চীন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে তার ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্বকে সব সময় সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে বলে কিমকে আশ্বস্ত করেন তিনি।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শি জিনপিংয়ের এই সফরের মূল উদ্দেশ্য বন্ধুত্ব নয়, বরং উত্তর কোরিয়ার ওপর চীনের প্রভাব বজায় রাখা। ঐতিহাসিকভাবে উত্তর কোরিয়ার বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ চীনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বেইজিং বরাবরই এখানে ‘সিনিয়র পার্টনার’ হিসেবে আধিপত্য বজায় রেখেছে। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে এই সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে। রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ সেনা ও অস্ত্র সরবরাহ করে পিয়ংইয়ং মস্কোর কাছ থেকে প্রায় ১৪.৪ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অর্থ ও সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও পুতিনের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ২ হাজার ৩০০ উত্তর কোরিয়ান সেনা নিহত হয়েছে। তেলের বিনিময়ে মস্কোকে পিয়ংইয়ংয়ের অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি ওয়াশিংটনের পাশাপাশি চীনকেও সতর্ক করেছে। চীন কখনোই চাইবে না পিয়ংইয়ংয়ের ওপর রাশিয়ার একক আধিপত্য তৈরি হোক। কারণ এতে কিমের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে।
বেইজিং এখনও পিয়ংইয়ংকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। মার্কিন ক্ষমতাকে খর্ব করা এবং আমেরিকার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে চীন, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া ও ইরানের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার এই ক্রমবর্ধমান সুসম্পর্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াকে উপেক্ষা করার ক্ষেত্রে কিম জং উনকে দীর্ঘমেয়াদি শক্তি জোগাবে।
তবে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেও, বেইজিং পিয়ংইয়ংকে সামরিকভাবে অতিরিক্ত শক্তিশালী দেখতে চায় না। রাশিয়ার সহায়তায় উত্তর কোরিয়া পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হলে তা কোরীয় উপদ্বীপের স্থিতিশীলতা ও শক্তির ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। চীন চায় না উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষার কারণে এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও মার্কিন-জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া ত্রিপক্ষীয় জোট আরও শক্তিশালী হোক। আবার পিয়ংইয়ংকে অতিরিক্ত চাপ দিলে তারা পুরোপুরি পুতিনের কোলে ঢলে পড়বে এমন আশঙ্কাও বেইজিংয়ের রয়েছে।
অন্যদিক থেকে, কিম জং উনের জন্যও চীনকে অপেক্ষা করে চলা অসম্ভব। গত বছর উত্তর কোরিয়ায় চীনের রপ্তানি বিগত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ২.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হলে রাশিয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে যেতে পারে। তাই কিমও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল।
মন্তব্য করুন