“কেহ বা মেম্বার, কেহ বা মিনিস্টার,/ আমরা কি তাহাদের নাম জানিতাম?”
শাহ আবদুল করিম যখন লিখেছিলেন–’আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’–সেই সময় এইসব নাম জানার দরকার ছিল না এবং রাজনীতিতে জনগণের উৎসাহও তেমন ছিল না। মানুষ জানত ঋতুর হিসাব, জমির ফলন, নদীর জোয়ার; ক্ষমতার অন্দরমহলের খুঁটিনাটি জানার দরকার পড়ত না তাদের। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ভোটের হাওয়া শুরু হতেই চায়ের টেবিল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া—সর্বত্র আমরা হন্যে হয়ে ঘুরেছি আর অপেক্ষা করেছি জানতে—কে আসবে সরকারে, কে হবেন মেম্বার, কে-বা হবেন মিনিস্টার? কেন জনগণের এত উৎসাহ?
আগে বাংলার বেশিরভাগ মানুষ গ্রামেই থাকত। চাকরির ধান্দায় কিংবা সরকারি অনুকূল্যের জন্য সরকারের দালালদের পেছনে দিনের পর দিন ঘুরতে হতো না। এখন ‘দিন হইতে দিন আসে রে কঠিন’; এই উৎকণ্ঠা কেবল কৌতুক নয়, কঠিন বাস্তব। তাই নতুন সরকার মানেই শুধু শপথ নয়—আশার পুনর্জন্ম এবং শঙ্কারও সূচনা।
কৌতূহলের অবসান হলো। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার শপথ সম্পন্ন হয়েছে। এখন নতুন হিসেবে নিকেশ শুরু হবে—কনস্টেবলের চাকরিটা পাওয়ার জন্য কাকে ধরতে হবে, কে দিতে পারবেন বালু তোলার লাইসেন্সটা, কিংবা কার গলায় মালা দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বা প্রক্টর হওয়া যাবে।
কেই বা মন্ত্রী এবং কেমন হলো সরকার—আমরা একবার চোখ বুলিয়ে দেখতে পারি।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। পঞ্চাশ সদস্যের মন্ত্রিসভাও শপথ নিয়েছে—২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী আর ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। যারা পূর্ণমন্ত্রী, সবাই পরিচিত নাম; এদের কেউ কেউ আগে মন্ত্রী ছিলেন, নতুন মুখ কমও কম নয়, খোদ প্রধানমন্ত্রীই প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হলেন। প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে বেশির ভাগই নতুন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের ৪১ জন কখনও কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেননি। বাকি নয়জনের বিভিন্ন সংসদে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে নতুন যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই নানান অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। বিএনপির শরিক দলের সবাই মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন, যাদের মধ্যে আছেন জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক ও ববি হাজ্জাজ।
মন্ত্রীদের কে কোন মন্ত্রণালয় পাচ্ছেন, এটা জানা হয়ে গেছে জনগণের। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট প্রকাশ বা প্রজ্ঞাপন জারি না হলে মন্ত্রণালয় বণ্টন চূড়ান্ত ধরা যায় না। শপথ নেওয়া মানেই নির্দিষ্ট দপ্তর পাওয়া নয়। সাধারণত প্রধানমন্ত্রী শপথের পর দপ্তর বণ্টনের সুপারিশ করেন, এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। সেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত সবই অনুমান বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হিসেবেই গণ্য হয়। তবে কয়েকজনের বিষয়ভিত্তিক সংশ্লিষ্টতা থেকে মন্ত্রণালয় আন্দাজ করা যায়। বিএনপি নেতা এবং সদ্য শপথ গ্রহণ করা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অনেকদিন ধরে বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কথা বলছেন। বিদেশি কূটনৈতিকদের সঙ্গে উঠাবসাও তার বেশি। তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি হয়তো অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিত্বের তালিকায় দেখে কেউ কি অবাক হয়েছেন? ভূ-রাজনীতি বিষয়ক কোনো মন্ত্রণালয় না থাকায়, তাকে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। নাকি শেষপর্যন্ত মার্কিন দূতিয়ালিতে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পেয়ে যাবেন?
বিএনপিতে স্বাস্থ্য খাতে ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনই এখন সর্বেসর্বা। তিনি খোদ খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক। তাকে সম্ভবত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার জন্যই মন্ত্রী করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও বিএনপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবসময় সোচ্চার। তবে বিগত কয়েক দিন ধরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে ফজলুর রহমানের নাম শোনা গেছে সবচেয়ে বেশি। তিনি নেই তালিকায়। মেজর হাফিজকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও দেওয়া যেতে পারে।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বাণিজ্য বা শিল্প মন্ত্রণালয় পেতে পারেন। এহছানুল হক মিলন আগেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে ছিলেন, এবারও তাই হতে যাচ্ছেন। ভুক্তভোগী অ্যাডভোকেট জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানকে হয়তো আইন মন্ত্রণালয়ের জন্যই মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির মন্ত্রিসভা বিএনপির আগের সরকারগুলোর মতোই হয়েছে; তেমন কোনো বৈচিত্র্য নেই। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সরকার পরিচালনায় বিএনপি পূর্বের চেয়েও পরিচ্ছন্নতা ও দক্ষতা আনতে পারবে?
বিরোধীদলের ছায়া মন্ত্রিসভা
যারা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি, তাদেরও তো দরকার কিছু সান্ত্বনা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির শীর্ষ নেতারা ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে তাদেরও ছায়ামন্ত্রী থাকবে।
একদিক দিয়ে এটা খুব ভালো; এই জন্য যে তরুণ নেতাদের বিরোধিতা ও আন্দোলন করতে কথায় কথায় শাহবাগে দৌড়াতে হবে না। তাদের ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা সংসদেই নিজ নিজ বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করতে পারবেন।
তবে এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন এনসিপিকে আরও নিবিড়ভাবে জামায়াতের রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলবে। যেসব তরুণেরা ধরে নিয়েছিল এটি ছিল শুধুমাত্র এনসিপির নির্বাচনী কৌশল, তারা হতাশ হবেন।
কে হবেন রাষ্ট্রপতি
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ নির্বাচনের পর তার মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে পদত্যাগ করার কথা আগেই বলেছেন। সুতরাং, নতুন সরকারকে রাষ্ট্রপতি পদে কাকে নির্বাচিত করা হবে, তা নিয়েও ভাবতে হবে।
রাষ্ট্রপতি পদের জন্য আলোচনায় রয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য—খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও নজরুল ইসলাম খান। কিন্তু এ দুজন ছাড়াও কাউকে কাউকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি পদে ঘুরেফিরে মুহাম্মদ ইউনূসের নামও আসছে। অন্তর্বর্তীকালের সরকারের সময় বিএনপির সঙ্গে তার সম্পর্ক আগাগোড়া বেশ ভালোই ছিল বলে মনে হয়, অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যার পদত্যাগ দাবি করেছিল বিএনপি, সেই খলিলুর রহমানই যদি মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পান, তবে মুহাম্মদ ইউনূসের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাকে কি আর উড়িয়ে দেওয়া যায়? অনেকেই বলবেন, ইউনূসের বিশ্বপরিচিতির জন্য রাষ্ট্রপতি পদে তিনি উপযোগী হবেন। তাছাড়া পৃথিবীর কয়টি দেশে একজন নোবেল বিজয়ী রাষ্ট্রপতি আছেন?
বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যার টেম্পারামেন্ট ও সুশীল আচরণ সর্বমহলে প্রশংসিত, তিনি মন্ত্রিসভায় থাকলেও রাষ্ট্রপতি পদের জন্যও বিবেচনায় আছেন। আওয়ামী লীগ আমলে শত বাধা-বিপত্তির মাঝেও বিএনপির মাঠপর্যায়ের সমর্থন অটুট রাখার কৃতিত্ব তার কম নয়। অনেকেই হয়তো তাকে সমর্থন করবেন; তবে একটা অসুবিধা আছে—সেটা হলো ‘বদরুদ্দোজা চৌধুরী’।
প্রাক্তন মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করে কী ঝামেলায় না বিএনপিকে পড়তে হয়েছিল! প্রেসিডেন্টের প্রোটোকল নিয়ে তার বাড়াবাড়ি নিয়োগদাতারা পছন্দ করেননি। তাই আরেকজন মহাসচিবকে প্রমোশন দিতে হাইকমান্ড হুঁশিয়ার থাকবেন! তবে একটা বড় পার্থক্য আছে—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বড় প্রোটোকলের লোক নন।
রাষ্ট্রপতি পদে সবসময় দলীয় লোক দিলেই যে দলের জন্য ভালো ফল মিলবে, বিএনপির ক্ষেত্রে তা বারেবারে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বদরুদ্দোজা চৌধুরী তো বটেই, ইয়াজউদ্দিন আহমদকে নিয়ে বিএনপিকে ভুগতে হয়েছিল।
এবার বিএনপি নির্দলীয় এবং স্বনামধন্য কোনো ব্যক্তিত্ব পদে বসিয়ে দেখতে পারে। এতে জনগণ আশ্বস্ত হবে এবং দলের ভাবমূর্তিও ভালো হবে।
সুশাসনই সাফল্যের চাবিকাঠি
বিএনপির যারা মন্ত্রী বা অন্যান্য নেতা রয়েছেন, তারা বেশিরভাগই সুপরিচিত। কিন্তু সরকারের গতিপথ নির্ধারণ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
যারা নব্বইয়ের দশকের তারেককে চিনেন, তারা বলবেন বিএনপি আওয়ামী লীগের মতোই দল। তারা তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়েই দেশ পরিচালনা করবে। সব জায়গায় থাকবে দলীয় লোকদের অধিপত্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে জামায়াতকে সরিয়ে সাদা দলের লোক বসাবে। প্রশাসনের শীর্ষে থাকবে বিএনপি-সমর্থক; অন্যরা হয়ে যাবেন ওএসডি। বিএনপির ডাক্তার দল দখল করবে হাসপাতাল এবং রাস্তার ফুটপাত দখল করবে বিএনপি হকার দল।
এই মডেল একসময় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অনেকভাবে কাজ দিয়েছিল। কিন্তু এখন তাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমাদের ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি ও দলীয় প্রশাসন কাজে লাগিয়ে তার শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে গিয়ে অল্পের জন্য প্রাণ হারাতে বসেছিলেন। ৫ অগাস্ট বাংলাদেশের জনগণ ক্যাডারভিত্তিক অপশাসনকে বাতিল করে দিয়েছে।
২০২৬ সালের তারেক রহমানকে যারা দেখেছেন, তারা বলবেন হয়তো তার মনে এইসব উপলব্ধিগুলো কাজ করবে এবং ২০০৬ সালের তারেক রহমান ও ২০২৬ সালের তারেক রহমান এক হবেন না। তার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তিনি দলীয় পেশিশক্তি ও ক্যাডারভিত্তিক প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে দেশ চালাবেন, না দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করবেন—তা দেখতে আমাদের খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না।
মন্তব্য করুন