আপনার সঠিক খাবার নির্বাচন, পরিমিত আহার এবং নিয়মিত হালকা ব্যায়াম— এ তিনটি বিষয় মেনে চললে রোজার মাসেও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টির প্রলোভন এড়িয়ে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। তাহলেই মাস শেষে নিজেকে আরও হালকা, ফিট ও প্রাণবন্ত অনুভব করবেন।সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকার পর হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার খেলে ওজন বেড়ে যাওয়া, অস্বস্তি কিংবা হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেদিক থেকে সাবধান থাকা উচিত। অথচ একটু সচেতন হলেই রোজার সময়টাকে স্বাস্থ্য ঠিক রাখার সুযোগে পরিণত করা সম্ভব। সে জন্য বাড়তি ক্যালরির বদলে যদি পুষ্টিকর, সুষম ও পরিমিত খাবার বেছে নেওয়া যায়, তাহলে শরীর থাকবে সতেজ, শক্তি থাকবে স্থিতিশীল, আর ওজন থাকবে নিয়ন্ত্রণে। তাই রমজানের রোজায় খাবারের পরিমাণ নয়, গুণগত মানেই হোক প্রধান গুরুত্ব।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, রমজানে কোন খাবারগুলো আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হবে—
১. শাকসবজি
সাধারণত শাকসবজি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্যতম প্রধান সহায়ক ভূমিকা রাখে। এতে ক্যালরি কম কিন্তু আঁশের পরিমাণ বেশি থাকে। আর আঁশ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।
যেমন—
* ইফতারে শসা, টমেটো, গাজর, লেটুস দিয়ে সালাদ রাখতে পারেন।
* সেহরিতে ভাজির বদলে হালকা সেদ্ধ বা কম তেলে রান্না করা সবজি রাখুন।
* ডাল বা স্যুপে বিভিন্ন সবজি যোগ করলে পুষ্টিগুণ বাড়ে।
* শাকসবজি শরীরের হজম প্রক্রিয়া ভালো রাখে।
* কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে, যা রোজায় অনেকেরই সমস্যা হয়ে থাকে।
* ফলমূল: প্রাকৃতিক মিষ্টিতে স্বাস্থ্যকর সমাধান।
ইফতারের সময় মিষ্টিজাতীয় খাবার শরবত কিংবা ভাজাপোড়ার বদলে ফল খাওয়া হতে পারে স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত। ফলে প্রাকৃতিক চিনি, ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। তাই এ সময় ইফতারে রাখা যেতে পারে তরমুজ, আপেল, পেয়ারা, কমলা, পেঁপে ও খেজুর।এছাড়া ইসলামে খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা সুন্নত। শুধু ইসলামিক দিক দিয়েই নয়, এতে রয়েছে সুস্থ থাকার মন্ত্র। খেজুরে আরও প্রাকৃতিক গ্লুকোজ থাকে, যা দ্রুত শক্তি জোগায়। তবে অতিরিক্ত খেজুর না খাওয়াই ভালো। কারণ ফল শরীরকে হাইড্রেট রাখে এবং অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ কমিয়ে দেয়।
২. ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী উপাদান প্রোটিন
দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি দেয় প্রোটিন এবং পেশি গঠনে সহায়ক। রোজার সময় আপনার শরীরের শক্তি ধরে রাখতে প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন গ্রিল বা সেদ্ধ মুরগি, মাছ, ডিম, ডাল ও ছোলা। ইফতারে ভাজা খাবারের বদলে গ্রিল বা সেদ্ধ প্রোটিন গ্রহণ করলে অপ্রয়োজনীয় চর্বি জমা কমে। সেহরিতে ডিম বা ডাল খেলে দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা লাগে না।
৩. শক্তির উৎস শস্য
সাদা ভাত কিংবা পরিশোধিত ময়দার রুটি দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং দ্রুত ক্ষুধা তৈরি করে। এর বদলে পূর্ণ শস্য গ্রহণ করলে শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়। যেমন—ব্রাউন রাইস, আটার রুটি, ওটস ও লাল চাল। এসব খাবারে আঁশ বেশি থাকে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়তে দেয় না। ফলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে।
৪. অল্পতেই তৃপ্তি বাদাম ও বীজ
ইফতারে ভাজাপোড়ার বদলে একমুঠো বাদাম খেলে তা শক্তি দেয় এবং অতিরিক্ত স্ন্যাকিং কমায়। তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কারণ বাদামে ক্যালরি তুলনামূলক বেশি। আর বাদাম ও নানা প্রকারের বীজ স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন ও আঁশের জন্য বেশ ভালো উৎস। অল্প পরিমাণেই পেট ভরে যায়। সে জন্য আপনার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন কাঠবাদাম, আখরোট, কাজুবাদাম, চিয়া বীজ ও তিসি বীজ।
৫. মেটাবলিজম সচল রাখার চাবিকাঠি পর্যাপ্ত পানি
রোজায় ডিহাইড্রেশন হলে অনেক সময় শরীর ক্ষুধা ও পানিশূন্যতার সংকেত গুলিয়ে ফেলে। ফলে অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়া হয় বেশি।
৬. ধীরে ধীরে পানি পান
ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ধীরে ধীরে ৮–১০ গ্লাস পানি পান করুন। একবারে বেশি পানি পান না করে বিরতি দিয়ে পান করুন। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত দ্বারা শরবত এড়িয়ে চলুন। কারণ পানি শরীরের বিপাকক্রিয়া সচল রাখে এবং হজমে সহায়তা করে থাকে।
৭. যেসব অভ্যাস মানলে ওজন বাড়বে না
ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এবং মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন। আর ধীরে ধীরে খাবার খান। কখনো তাড়াহুড়ো করে খাবেন না। এর কারণ এতে অনেক বেশি পরিমাণে খাওয়া হয়। আর কখনো সেহরি বাদ দেবেন না। ইফতারের পর ২০–৩০ মিনিট হালকা হাঁটা বা ব্যায়াম করুন। ঘুম ঠিক রাখুন, অপর্যাপ্ত ঘুম ওজন বাড়াতে ভূমিকা রাখে।